বেনাপোল বন্দরের শেড থেকে এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে
এখনো পুড়ে যাওয়া বেনাপোল স্থলবন্দরের ২৩নং শেড থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এ শেডের আশপাশে পোড়া গন্ধে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন কেমিক্যাল গলে পানিতে সয়লাব হয়ে পড়েছে। ফলে মালামাল লোড-আনলোডে সাময়িক অসুবিধা দেখা দিয়েছে।
তদন্ত কমিটির কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শেডের মধ্যে পুড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলার কাজও করা যাচ্ছে না। প্রতি বছর শতকরা ৫ ভাগ ভাড়া বৃদ্ধি করলেও বেনাপোল বন্দর উন্নয়নে কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়নি বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের অব্যবস্থাপনা নিজ চোখে না দেখলে বোঝা কঠিন যে এখানে জনবল সঙ্কট কতটা প্রকট।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকরা তাদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর বেনাপোল বন্দরের সহকারী পরিচালক আব্দুল হান্নানকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী ১০ দিনের মধ্যে তাদের রিপোর্ট প্রদান করবে।
অপরদিকে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষও একটি কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত কমিশনার ফিরোজ উদ্দিনকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিতে রয়েছেন আরো ৪ সদস্য। তারা ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট প্রদান করবেন।
অন্যদিকে একজন যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ৪ সদস্য বিশিষ্ট অপর একটি কমিটি গঠন করেছে। ৩টি তদন্ত কমিটির মধ্যে স্থলবন্দর ও কাস্টমসের দুইটি তদন্ত কমিটি সোমবার সকাল থেকে কাজ শুরু করেছেন। তবে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি এখনো তাদের কাজ শুরু করেনি। তারা মঙ্গলবার সকাল থেকে বেনাপোলে তদন্ত কাজ শুরু করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
এদিকে, বন্দরের ২৩ নং শেডে আগুন নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত ওই শেডে আমদানিকৃত কয়েকটি ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক থেকে পণ্য আনলোড করা হয়। সেখানে কেউ সিগারেট খেয়ে ফেলে দিয়েছে যেখান থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে অনেকে মনে করেন।
আবার ওই শেডের ইনচার্জ জানান, শেডের পাশে একটি পোস্ট লাইনে গত ১১ সেপ্টেম্বর আগুন লাগে। হ্যান্ডিলিং শ্রমিকদের সহযোগিতায় সে যাত্রা রক্ষা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর লিখিতভাবে বৈদ্যুতিক লাইন মেরামতের জন্য আবেদন দেওয়া হয় কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু তারপরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আর এ কারণে শটসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে।
অনেকে ধারণা করছেন, বন্দরের অব্যবস্থাপনা ও চুরির প্রমাণ লুকাতে অগ্নিকাণ্ডের মত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানো হয়ে থাকে এ বন্দরে। বন্দর প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭ বার এ বন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ৬শ কোটি টাকার মালামাল পুড়ে যায়। যার কোনো ক্ষতিপুরণ আজো পায়নি আমদানিকারকরা।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরে রক্ষিত মালামালের ভাড়াসহ অন্যান্য অর্থ আদায় করলেও কোনো বীমা করেন না রহস্যজনক কারণে। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে তদন্ত গঠিত হলেও রহস্যজনকভাবে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
দেশের সব চেয়ে বড় বেনাপোল স্থলবন্দরে ৩৮টি ওয়ার হাউজ বা শেড আছে। আর ওপেন ইয়ার্ড রয়েছে ৫টি। এসব শেড ও ইয়ার্ডে আমদানিকৃত থেকে ৪৫ হাজার টন পণ্য থাকার কথা থাকলেও সেখানে রয়েছে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন পণ্য। প্রতিটি শেডে ঠাসাঠাসি করে রাখা হয় এসব পণ্য।
পণ্যবাহী ট্রাকগুলো রাখার জায়গায় মাসের পর মাস রাখা হয় বিভিন্ন কোম্পানির ট্রাক চেচিসসহ পরিবহন। যার ফলে এসব পণ্যবাহী ট্রাক রাখা হয় বন্দরের সড়কে। দাহ্য পদার্থের জন্য আলাদা জায়গা থাকার পরও প্রায় শেডে রাখা হয় দাহ্য পদার্থ। বন্দরের অভ্যন্তরে বৈদ্যুতিক লাইনগুলো ঠিকমত মেরামত না করায় শটসার্কিটেও আগুন লেগেছে কয়েকবার।
এতবড় বন্দরে মাত্র ২ জন বাইরের বৈদ্যুতিক মিস্ত্রিকে মাস্টার রোলে নিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। এখানে নেই দক্ষ কোনো বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনিয়ার। বন্দরের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার না করে বাইরে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। ২০১৩ সালের ২৩ মার্চ বন্দরের ৩ লাখ টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বাইরে পাচারের সময় আটক করা হয়। এ ঘটনায় তৎকালীন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুতও করা হয়।
বন্দরের নিজস্ব হাইড্রেন পানি সাপ্লাই ব্যবস্থা থাকলেও অগ্নিকাণ্ডের সময় কাজ করে না। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না। বন্দরের ফায়ারম্যানদের তেমন কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। দায়িত্ব পালনেও তাদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া বন্দরের নিজস্ব পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ছাড়াও নিকটবর্তী বেনাপোল ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের একটি ইউনিট রয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনার বাইরে ওই একটি ইউনিটই ভরসা। এ পর্যন্ত যতবার এ বন্দরে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আগুন নিভাতে পারেনি। নির্ভর করতে হয় বাইরের ফায়ার সার্ভিসের উপরে।
বন্দরের একজন সহকারী ফায়ার পরিদর্শকের নেতৃত্বে ৩ জন ফায়ারম্যান কাম হাইড্রেন অপারেটর থাকলেও অগ্নিকাণ্ডের সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। রোববারের অগ্নিকাণ্ডের সময় তাদের মোবাইল বন্ধ ছিল। সার্বক্ষণিক বন্দরের অভ্যন্তরে তাদের থাকার কথা থাকলেও ওইদিন তারা কেউ ছিল না বলে জানান বন্দর ব্যবহারকারীরা।
প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় আগুন নেভাতে ব্যর্থ হচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর এ কারণে বার বার আগুনে পুড়ে যাচ্ছে আমদানিকারকদের কোটি কোটি টাকার মালামাল। তাছাড়া বন্দরের শেড ও ইয়ার্ড থেকে প্রায়ই পণ্য চুরির ঘটনা ঘটছে। চুরির প্রমাণ লুকাতে বন্দরের এক শ্রেণির কর্মচারিরা অনেক সময় অগ্নিকাণ্ডের মত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল।
এ ব্যাপারে বন্দর ব্যবহারকারী বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান জানান, বেনাপোল বন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার ফলে ব্যবসায়ী মহলে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। আমরা জরুরী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকদের প্রতিনিধিদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা হাতে পাওয়ার পর পরই বিষয়টি নিয়ে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের উপ পরিচালক (ট্রাফিক) আব্দুল জলিল জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো জানা যায়নি। আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনই বলা সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত ওই শেডে ১১৫টি পণ্য চালানের কাগজপত্র পাওয়া গেছে। ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত এই শেডে আর কি পণ্য আনলোড করা হয়েছে সেটা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
এছাড়া আর কোনো পণ্য ছিল কিনা তাও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সব কিছু হাতে পেলে তবেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আগে কোনো পোড়া পণ্য ওই শেড থেকে সরানো যাবে না বলে জানান তিনি।
রোববার ভোরে বেনাপোল স্থলবন্দরের ২৩নং শেডে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কয়েক কোটি টাকার আমদানিকৃত মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই শেডে বিভিন্ন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানিকৃত কাপড়, ডাইস, বিভিন্ন কেমিকেল, মেশিনারি পার্টস, মোটর পার্টস, ফাইবার, মশা তাড়ানো স্প্রে নিউ হিট, তুলা অ্যাসোসিয়েডস গুডস ও কাগজ, রক্ষিত ছিল।
জামাল হোসেন/এফএ/আরআইপি