ভুয়া ছাত্র-ছাত্রী দিয়ে চলছে বিদ্যালয়টি
ছাত্র-ছাত্রী নেই। নেই অবকাঠামো। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের নাম ব্যবহার করে নিয়মিত হাজিরা দেখানো হচ্ছে। ভুয়া ছাত্র-ছাত্রী দেখিয়ে চলছে পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা। বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই, শুধুমাত্র কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ভুয়া স্কুল চলছে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের সুন্দরবন সংলগ্ন খুড়িয়াখালী (স্থানীয় নাম শরণখোলা) গ্রামে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন চরের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ‘চরপাড়া-মাতৃভাষা প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৪ সালে। সেটি সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে নিজস্ব জমি, অবকাঠামো, কোটা অনুযায়ী শিক্ষক সংখ্যা ও ছাত্র-ছাত্রী। চলছে মডেল টেস্ট। রয়েছে নিয়মিত বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিও।
কিন্তু স্থানীয় এক স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বিদ্যালয়টি দখলে নিতে একই নাম ব্যবহার করে তা অনুমোদনের জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পাল্টা একটি আবেদন দাখিল করেছেন। ওই চক্রটি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে পূর্বপ্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি তাদের বলে চালানোর চেষ্টা করছে। এমনকি পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্টে পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী নিজেদের বলে চালানোর চেষ্টা করলে তা ফাঁস হয়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, ওই চক্রের হোতা স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তান আবু আসলাম তুহিন বয়াতী ও তার ভাই আবুল হাসান মাসুদ সদ্য বিদায়ী শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহমেদ ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে বিদ্যালয়টি তাদের নামে অনুমোদনের চেষ্টা করেন। এমনকি কোনো প্রকার তদন্ত না করেই অনুমোদনের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসে একটি ভুয়া প্রতিবেদনও পাঠিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণ সাউথখালী সিএসবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে কয়েকটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্ট চলছে। মডেল টেস্টে শরণখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেমায়েত, শাহরিয়ার, পারভেজ, জায়েদা আক্তার ও সুমাইয়া অংশগ্রহণ করে। কিন্তু প্রতিপক্ষ চক্রটি ওই পাঁচ শিক্ষার্থীকে তাদের বলে চালানোর চেষ্টা করে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলী মুন্সী, আদম আলী মুন্সী, সিদ্দিক হাওলাদার, আসাদুলসহ অনেকেই জাগো নিউজকে জানান, চরপাড়া-মাতৃভাষা বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। এটি চরের শিশুদের শিক্ষার জন্য অত্যন্ত দরকারি। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল একই নামে আরেকটি বিদ্যালয় অনুমোদনের জন্য পাঁয়তারা শুরু করেছে। যাতে ওই বিদ্যালয়টি ধ্বংস হয়ে যায়। চলমান বিদ্যালয়টি অনুমোদনের জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানতে চাইলে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নামধারী আবুল হাসান মাসুদ ওই পাঁচ শিক্ষার্থীর ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, একই নামে অন্য আরেকটি বিদ্যালয় অনুমোদনের চেষ্টা চলছে।
চরপাড়া-মাতৃভাষা প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. বাচ্চু মুন্সী বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন চর এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের লেখাপড়ার জন্য ২০০৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকার তৃতীয় ধাপে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দিলে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করা হয়। সে অনুযায়ী প্রক্রিয়াও চলমান। কিন্তু স্থানীয় ওই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র শিক্ষা কর্মকর্তাকে ম্যানেজ দিয়ে বিদ্যালয়টি তাদের নামে অনুমোদনের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আখতার হোসেন (ভারপ্রাপ্ত) তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীর নামে হাজিরা দেখানো হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিইপিও) অশোক কুমার সমদ্দার বলেন, বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করে জেলা যাচাই-বাছাই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা অনুমোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এআরএ/এবিএস