বরগুনায় দুই কিশোরকে নির্যাতনের অভিযোগ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৫:০৪ এএম, ০৮ অক্টোবর ২০১৬

বরগুনার পাথরঘাটার একটি কাপড়ের দোকানে চুরির অপবাদে দুই কিশোরকে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের খলিফারহাট বাজারে এ ঘটনা ঘটে।

পরে তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রাত ১০টার দিকে পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। নির্যাতনের পর তাদের কাছ থেকে রাখা হয়েছে স্ট্যাম্প ও সাদা কাগজে স্বাক্ষরও।

নির্যাতনের শিকার দুই কিশোরের নাম মো. রুবেল (১৪) এবং আনোয়ার (১৪)। তারা চরদুয়ানী ইউনিয়নের তাফালবাড়ি গ্রামের আবুল বাশার ও ইসমাইল হোসেনের ছেলে। রুবেল চরদুয়ানী ইউনিয়নের খলিফারহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষার্থী আর আনোয়ার স্থানীয় একটি হাফেজি মাদরাসার ছাত্র।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাথরঘাটা উপজেলার খলিফারহাট বাজারের মায়ের দোয়া বস্ত্রালয়ের মালিক মো. ছগির হোসেনের দোকানে গত ১ অক্টোবর রাতে চুরির ঘটনা ঘটে। এ সময় চোরেরা তার দোকান থেকে শাড়ি, লুঙ্গি ও থ্রি পিসসহ দোকান থেকে আরো অনেক মালামাল নিয়ে যায়।

কিশোর রুবেলের মা মোসা. বুলবুলি বেগম (৩৫) বলেন, চুরি হওয়া দোকানের মালিক ছগির, চরদুয়ানী ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. মজিবুর রহমান, ৭ নং ওয়ার্ডের সদস্য কবীর মোল্লা এবং ৮ নং ওয়ার্ডের আবদুর রহমানসহ তার অন্য সহযোগীরা দোকানে চুরির জন্য আনোয়ারকে সন্দেহ করে বেদম প্রহার করে।

কিন্ত আনোয়ার এ ঘটনার সঙ্গে তার নিজের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলে ছগির ও তার দোসররা আনোয়ারের উপর নির্যানতের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে তার ছেলে রুবেলসহ আরো তিন-চারজনের নাম বলার জন্য বলে। নির্যাতনের কারণে সকলের সামনে আনোয়ার রুবেলসহ আরো দুই-তিনজন কিশোরের নাম বলে। এ সময় তারা রুবেলকে বাড়ির কাছাকাছি থেকে আটক করে অমানবিক নির্যাতন করে।

তিনি আরো বলেন, রুবেল ও এ ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা বার বার অস্বীকার করলে তার উপর নির্যাতনের মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়া হয়। পরে রুবেল এবং আনোয়ারকে নিয় যাওয়া হয় ইউনিয়ন পরিষদে। এরপর ইউনিয়ন পরিষদের নিয়ে করা হয় আবারো অমানবিক নির্যাতন।

এ সময় তিনি স্থানীয়দের কাছে খবর শুনে ছেলেকে উদ্ধার করতে ছুটে যান ইউনিয়ন পরিষদে। তার সামনেও করা হয় রুবেল ও আনোয়ারকে মারধর। পায়ের নিচে ঢুকানোর জন্য আনা হয় বড় সুই। হাত-পায়ের নখ তুলে নেয়ার জন্য আনা হয় প্লাস।

রুবেলের মা আরো বলেন, এমন নির্যাতন থেকে ছেলেকে রক্ষার জন্য তিনি উপস্থিত সকলের হাত-পা ধরে আকুতি-মিনতি করেন। পরে ইউনিয়ন পরিষদের তিন সদস্য তার ছেলেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এ সময় তিনি ছেলেকে উদ্ধারের জন্য তাৎক্ষণিক ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেন এবং বাকি টাকার জন্য তিনি ও তার ছেলে রুবেলের কাছ থেকে সাদা কাগজ চারটি ও ৫টি স্ট্যাম্পে আটটি স্বাক্ষর নেয়।

এ বিষয়ে মা বস্ত্রালয়ের মালিক মো. ছগির দুই কিশোরকে মারধরের কথা অস্বীকার করে বলেন, ওরাই আমার দোকানে চুরি করেছে। ওদের কাছ থেকে চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওদের মা ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হওয়ায় চুরি হওয়া মালামাল আমরা উদ্ধার করিনি। মারধরের কথা অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত তিন ইউপি সদস্যও।

আনোয়ারে মা মোসা. হাফিজা আক্তার বলেন, আমার ছেলে কোনো অপরাধ না করার পরও ছগির ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা আমার ছেলেকে বেদম মারধর করে। এরপর ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে আমাকেও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বলে। ছেলেটা ব্যথায় কাতরাচ্ছিল। তাই আমি ছেলেকে মারধর থেকে বাঁচানোর জন্য স্ট্যাম্পে ও সাদা কাগজে টিপ সই দেই এবং আমার ছেলের স্বাক্ষর রেখে ছেড়ে দেয়।

তিনি আরো বলেন, মায়ের সামনে সন্তানকে নির্যাতন কোনো মাই সহ্য করেত পারে না। তাই আমি আমার নিরাপরাধ ছেলেকে বাঁচানোর জন্য তাদের কথায় স্ট্যাম্পে ও সাদা কাগজে টিপ সই দিয়েছি।

পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্যাতনে শিকার ওই দুই কিশোরকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১২ ও ১৩ নম্বর বেডে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তাদের শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সুস্থ হয়ে উঠতে ওদের আরো পাঁচ-সাতদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে।

এ বিষয়ে পাথরঘাটা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, দুই কিশোরকে নির্যাতনের ঘটনা তিনি শুনেছেন। এ ব্যাপারে অভিযোগ পেলে পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সাইফুল ইসলাম মিরাজ/এসএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।