রোয়ানুর ক্ষত শুকায়নি এখনো


প্রকাশিত: ০৭:২৪ এএম, ১৪ অক্টোবর ২০১৬

ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর কবলে পড়ে ক্ষত-বিক্ষত হওয়া কক্সবাজারের উপকূলবাসী এখনো বিপর্যস্ত সময় পার করছেন। বিগত পাঁচ মাসেও ভাঙা কিংবা বিলীন হওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার না হওয়ায় কক্সবাজার সদর উপজেলার উপকূলীয় পোকখালী, চৌফলদন্ডী ও খুরুশকুল এবং মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নের লোকালয়ে এখনো চলছে জোয়ার-ভাটা। চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে শত কিলোমিটার আভ্যন্তরিণ সড়ক-উপসড়ক।

গত ২১মে রোয়ানুর আঘাতে প্রায় অর্ধশত কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে ও বিলীন হয়ে যায়। ১৯৯১ সালের জলোচ্ছ্বাসের পর বেড়িবাঁধ টেকসই করণে বিগত ২৫ বছরে কার্যত কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় এ পরিস্থিতি হয়েছে বলে দাবি ভূক্তভোগীদের।

কক্সবাজারের উপকূলীয় পোকখালী ইউনিয়নের উত্তর গোমাতলী ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মোহাম্মদুল হক দুখু মিয়া জানান, ঘুর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে সদরের খুরুশকুল, চৌফলদন্ডী, পোকখালী ও গোমাতলী এলাকার বেড়িবাধের বেশ কয়েকটি অংশ ভাঙনের কবলে পড়ে। প্রায় ভাঙন স্থানীয় ভাবে মেরামত সম্ভব হলেও উত্তর গোমাতলী ৬ নম্বর স্লুইস গেইট এলাকার এক থেকে দেড়শ গজের ভাঙনটি অনেক চেষ্টা করেও সংস্কার সম্ভব হয়নি।

এ ভাঙন দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে উত্তর গোমাতলী, পশ্চিম গোমাতলী, চরপাড়া, কোনাপাড়া, বাঁশখালী পাড়া, আজিমপাড়া, কাটাখালী, বারডইল্যাপাড়া, রাজঘাট, পূর্ব গোমাতলীর প্রায় অর্ধলাখ মানুষকে জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভরশীল করেছে।

Rohanu

পশ্চিম গোমাতলী ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আলাউদ্দিন জনি জানান, জোয়ারের পানিতে এলাকার প্রায় ১০ হাজার একর জমির কয়েকটি ঘের তলিয়ে যাওয়ায় ডুবে যাচ্ছে নিচু এলাকার রাস্তা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উত্তর গোমাতলী সরকারি প্রাথামিক বিদ্যালয়, গোমাতলী উচ্চ বিদ্যালয়, মোনছেহেরিয়া দাখিল মাদরাসা, অনেক মক্তব ও  নূরানী মাদরাসাসহ নানা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।

জোয়ারের সময় অনেক বাড়িতে হাটু পরিমাণ পানি ঢুকে দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না। তখন ভাটা নামা পর্যন্ত রাস্তার উপরেই অবস্থান করতে হয় শত শত মানুষকে। বাড়িতে অবস্থান দূরূহ হয়ে পড়ায় অনেকে পরিবার নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেছে। পানির ধাক্কায় ঈদগাঁও-গোমাতলী কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা সড়ক ভাঙনের কবলে পড়ায় স্বাভাবিক যান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।  

সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদগাঁও-গোমাতলী কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা পাকা সড়কের পূর্ব গোমাতলী ইউছুপের বাড়ির নিকটস্থ এলাকা, পূর্ব কাটাখালী সংযোগ স্থল অংশ, পশ্চিম গোমাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিকটস্থান, গোমাতলী উচ্চ বিদ্যলয়ের দক্ষিণাংশ, উত্তর গোমাতলী কাটাখালী পশ্চিমাংশ ব্রিজ এলাকা, ফয়সাল সেন্টারের দক্ষিণাংশ, উত্তর গোমাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ ও উত্তরাংশ ভাঙনের কবলে পড়েছে। জোয়ারের সময় এলাকায় পানি ঢুকলে এসব ভাঙন দিয়ে বৃহত্তর গোমাতলী পানিতে একাকার হয়ে যায়। এসময় জরুরি প্রয়োজনে চলাচলের বাহন হিসেবে নৌকাই একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে।

গোমাতলী মোহাজের কৃষি উপনিবেশ সমিতি ও চিংড়িচাষী নেতা সাইফুদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন জানান, ৬ নম্বর স্লুইস গেইটটির দুইপাশেই গভীর খাল। এ কারণে ভাঙনটি দিন দিন কেবল বড়ই হয়েছে। মরা কাটাল কিংবা ভরা কাটাল (স্থানীয় ভাষায় জোঁ) উভয় সময় এ ভাঙন দিয়ে পানি ঢুকছে।  পাউবোর কক্সবাজার এলাকার ৬৬/৩ পোল্ডারের গোমাতলী এলাকার প্রায় দুই আড়াইশ হাতের এ ভাঙন বৃহত্তর গোমাতলীর অর্ধলাখ মানুষকে ভোগাচ্ছে।

Rohanu

বাঁধ বরাবর খরোস্রোত থাকায় ভাঙনটি মেরামতে বিকল্প উপায় হিসেবে ঘের মালিকরা প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ করে রিং বাধ দিয়েছিলেন। কিন্তু জোয়ারের তীব্রতা এ মাটি টিকতে দেয়নি। এলাকার ধানি জমিতে চাষ করা দূরের কথা ঘেরে চিংড়ি চাষও করা যায়নি।

উপকূলীয় পোকখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিক আহমদ ও চৌফলদন্ডী ইউপি চেয়ারম্যান ওয়াজ করিম বাবুল বলেন, অর্ধলাখ মানুষের নিত্য দূর্ভোগ লাঘবে পাউবোর কাছে বেশ কয়েকবার আবেদন দেয়া হয়েছে। কাজের কাজ কিছু হয়নি। তাদের পরামর্শে বিশ্ব ব্যাংকের ফান্ড থেকে বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতর ও সংশ্লিষ্ট শাখায় আজকালের মধ্যে আবেদন করা হবে।

প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নেও।

ধলঘাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান কামরুল হাসান ও মাতারবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ উল­াহ বলেন, গত বছর ঘূর্ণিঝড় কোমেনের কবলে পড়ে ধলঘাটার চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। কিন্তু বাঁধ সংস্কারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

এবার রোয়ানুতে বিলীন হয়ে গেছে আরো ছয় কিলোমিটার বাঁধ। এতে জোয়ারের পানিতে ভাসছে ১২টি গ্রামের অন্তত ১০ হাজার মানুষ। মাতারবাড়ীর দক্ষিণ রাজঘাট, টিয়াকাটি, রাঙ্গাখালী ও রুস্তমের দোনা এলাকার প্রায় তিন কিলোমিটার ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে সাইরার ডেইল, মগডেইল, মাইজপাড়া, ফুলজান মোরা, দক্ষিণ রাজঘাট, লাইল্যাঘোনা, বানিয়াকাটা, সিকদারপাড়া, মিয়াজিরপাড়া, মাঝেরডেইল ও নয়াপাড়া গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে।

Rohanu

একইভাবে ধলঘাট ইউনিয়নের পণ্ডিত ডেইল, সাপমারার ডেইল, সুতরিয়া, সরইতলা, বনজামিরা, মুহুরিঘোনা ও নাসির মোহাম্মদ ডেইল এলাকার ছয় কিলোমিটার ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে ঢুকেছে জোয়ারের পানি। এসব স্থানে কাদায় ভরা সড়কে চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া ঘরেও জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ায় রান্না-বান্নায় সমস্যা হচ্ছে বেশি। কোনো কাজ না থাকায় অনেকের আয়-রোজগারও বন্ধ। সরকারি সহযোগিতাও অপ্রতুল।  

এ চেয়ারম্যানদ্বয়ের মতে, চারপাশে ব্লক দিয়ে টেকসই বেড়িবাঁধ না করলে মাতারবাড়ি-ধলঘাটি এলাকাটি সাগরে তলিয়ে যাবে। তাই জরুরি ভিত্তিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণে জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিতভাবে আবেদন করেছি। কিন্তু পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও বাঁধ সংস্কার হয়নি।

কক্সবাজারের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনজুর আলম সিদ্দিকীর মতে, উপকূল রক্ষায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেড়িবাঁধ মেরামত আবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনে সব প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের পাউবোর সঙ্গে সমন্বিত করা যায়। বাঁধ মেরামত না করে আভ্যন্তরিণ সড়ক মেরামত করলে তা কোনো কাজে আসবে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, ভাঙা বাঁধের কিছু কিছু অংশ সংস্কারে ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বাকি বরাদ্দ হাতে এলে যত দ্রুত সম্ভব সবার সহযোগিতায় টেকসই বাঁধ নির্মাণে প্রচেষ্টা চালানো হবে।

এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।