মামলার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালরা
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় তাদের পক্ষে দায়ের করা মামলা নিয়ে শহরে চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা। এ মামলার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের। দ্বিধা কাজ করছে তাদের মনে।
ঘটনার ১১ দিন পর মামলার পক্ষে বিপক্ষে চলছে নানা ধরনের আলোচনা। মামলার বিষয়টি এখন টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।
পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালপল্লীর বাসিন্দা এবং তাদের নেতাদের প্রশ্ন, ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্য থেকে কেউ এ মামলা না করে বাইর থেকে একজন এসে সাঁওতাল পরিচয়ে এ মামলা করার উদ্দেশ্য কী। মামলার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ তাদের।
এদিকে আদিবাসী ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাঁওতালদের ওপর হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় আরেকটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। বাগদা ফার্ম আদিবাসী ভূমি উদ্ধার কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাসকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের পক্ষে দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার মুয়ালীপাড়া গ্রামের সমেস মুরমুরের ছেলে স্বপন মুরমু বাদী হয়ে বুধবার রাতে অজ্ঞাত পরিচয় পাঁচশ থেকে ছয়শ জনকে আসামি করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা করেন।
এ মামলার বিষয়টি নিয়ে এখন গোবিন্দগঞ্জসহ সাঁওতালপল্লীতে নানা প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে। কারো কারো প্রশ্ন, সাঁওতালদের পক্ষে মামলা দায়েরকারী স্বপন মুরমু নামের ওই ব্যক্তি সাঁওতালদের ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির কোনো নেতা নন, এমনকি তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারেরও কেউ নন। তবে কেন তিনি সাঁওতালদের পক্ষ নিয়ে মামলা করলেন। এখানে অন্য কিছু কাজ করছে কিনা তা নিয়েও চলছে সমালোচনা।
সাঁওতালদের ধারণা, বিশেষ প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষায় তাকে দিয়ে মামলা করা হয়েছে। এ নিয়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলাসহ গোটা জেলায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।
যদিও মামলার পরই অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া শনিবার ভোরে সাপমার ইউনিয়নের তরফকামাল গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে মৃত নায়েব আলীর ছেলে ছরোয়ার হোসেন (৪২) ও একই গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে আকবর আলীকে (৫০) গ্রেফতার করে পুলিশ। এ নিয়ে ওই মামলায় পুলিশ ১০ জনকে গ্রেফতার দেখিয়েছে।
মামলার পর পুলিশের ভূমিকাও নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তবে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার কোন সাঁওতাল বা ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির নেতাদের সঙ্গে তাদের পক্ষে মামলা দেয়ার জন্য পুলিশ একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন পুলিশের স্বার্থেই হয়তো মামলাটি করা হয়েছে।20161119202456.jpg)
গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত কুমার সরকার জানান, মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে।
এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের গ্রেফতার করতে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার বিষয়ে যাতে কেউ স্বার্থ হাসিল না করতে পারে এবং নিরপরাধ কেউ হয়রানি না হয়, সে বিষয়ে পুলিশের নজরদারি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
শনিবার দুপুরে মোবাইল ফোনে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম আদিবাসী ভূমি উদ্ধার কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, স্বপন মুরমুর দায়েরকৃত মামলাটি মূলত স্থানীয় কিছু লোকজনকে হয়রানি করতে এবং সাঁওতালদের প্রশ্নবিদ্ধ করতেই। তবে তাদের কমিটির পক্ষ থেকে শিগগিরই এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা করা হবে, যার প্রস্তুতি চলছে।
প্রসঙ্গত, গত ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের আখ কাটাকে কেন্দ্র করে খামারের জমি দখলকারী সাঁওতালের সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারী ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়।
এ সময় সাঁওতালদের ছোড়া তির-ধনুকের আঘাতে ১০ পুলিশ তিরবিদ্ধসহ ৩০ জন আহত হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত সাড়ে ৩০০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করে। এ মামলায় পুলিশ চারজনকে গ্রেফতার করেছে।
জিল্লুর রহমান পলাশ/এএম/আরআইপি