‘মা, তোমার জন্য স্বাধীনতা আনতে যাচ্ছি’


প্রকাশিত: ০১:০৪ পিএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬

দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই। সেদিন দুপুর দেড়টা-২টার দিকে পাজামা আর জামা পরে আমার আজাদ (শহীদ আবুল কালাম আজাদ) সামনে এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সে বলে উঠল, ‘বহু দূরে যাচ্ছি। আমার জন্য দোয়া করো মা।’

কারণ জিজ্ঞাসা করতে সে উত্তর দেয়, ‘মা, তোমার জন্য স্বাধীনতা আনতে যাচ্ছি।’ এভাবে কথাগুলো বলছিলেন শহীদ আবুল কালাম আজাদের মা ননী বেওয়া। যখন কথাগুলো বলছিলেন ঠিক তখন তার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল।

তখন স্বাধীনতার মানে জানতাম না, বুঝতেও পারিনি। আজ আমি বুঝি স্বাধীনতা কী। কিন্তু যে স্বাধীনতার জন্য আমার বুকের ধন জীবন দিয়েছে, শহীদ হয়েছে, সেই স্বাধীনতা আমি আজও পাইনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি দুই মেয়ে আর এক ছেলের মা।

তিনি বলেন, সে সময় সিরাজগঞ্জ মহুকুমার জানপুর মহল্লা­ায় স্বামীসহ পাঁচজনের সংসারে অভাব থাকলেও অশান্তি ছিল না এতটুকু। আজাদের বাবা হোসেন আলী সেখ ছিলেন কর্মঠ শ্রমিক। ওই সময় আবুল কালাম আজাদ সিরাজগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছিল। ইচ্ছা ছিল, ছেলে পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি করবে।

SIRAJGONJ

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আবুল কালাম আজাদের মা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের দমনপীড়ন আর অত্যাচার তাদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। আজাদ এ সময় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জবাসীকে সোচ্চার করতে সে দিন-রাত কাজ করেছে। তার বাবা এজন্য তাকে সাবধান করলেও কখনো নিষেধ করেননি।

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় আজাদ সিরাজগঞ্জের বেশ কিছু যুবকের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য ভারতে রওনা দেয়। ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের বালুঘাট এলাকায় দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণ নেয় আজাদ। এরপর দেশে ফিরে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে।

জানা যায়, ৭ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর কামরুজ্জামানের অধীনে দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন আজাদ। ১৯৭১ সালের ১৭ জুলাই আজাদ দিনাজপুর জেলার হিলি থানার কোরিয়া গ্রামে পাকবাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হন। এই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।

শহীদ আজাদের মাতা ননী বেওয়া জানান, মৃত্যুর আগে আজাদকে নানাভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। দেশ স্বাধীনের পর আমার সন্তানের খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি শোক বার্তাসহ এক হাজার টাকা আমার কাছে পাঠানো হয়। তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহুকুমা প্রশাসকের কাছ থেকে এগুলো নিতে গিয়েই জানতে পারি আমার সন্তানের শহীদ হওয়ার ঘটনা।

এরপর স্বাধীন দেশে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে অভাব-অনটনে শুরু হয় আমার পথচলা। স্বাধীনতার তিন বছর পর আজাদের বাবা মারা যান। দুই কন্যা সন্তান নিয়ে কোনো রকমে চলতে থাকে আমার দিন। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ আজাদের মাতা হিসেবে আমাকে আট শতক জমির ওপর একটি বাড়ি এবং সাড়ে ২৯ শতক পরিমাণের একটি পুকুর দেয়া হয়।

সেই জায়গাতে দুই কন্যাকে সঙ্গে নিয়েই বসবাস করছি। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত না দেয়ায় এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। কোন সরকার আমাদের তুলে দেয় সেই চিন্তা সবসময় আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তবে রাষ্ট্রীয় ভাতা পাচ্ছি নিয়মিত।

SIRAJGONJ

দেশ স্বাধীনের পর একাধিক সরকার পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু আজও এ বাড়ি এবং পুকুরটির স্থায়ী বন্দোবস্ত আমাকে দেয়া হয়নি। ১৯৮৫-৮৬ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বরাদ্দ করা বাড়িতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।

২ যুগ অতিবাহিত হলেও শহীদ আবুল কালাম আজাদ স্মৃতিসৌধটির অনেক অংশ দেবে গেছে। কিছু অংশ ভেঙে গেলেও তা সংস্কার করা হয়নি। প্রতি বছর ১৭ জুলাই আমার সন্তানের শহীদ দিবসে আমি নিজেই ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করি। পারিবারিকভাবে আমরা এ স্মৃতিসৌধে মিলাদ মাহফিল আর শ্রদ্ধা জানালেও অন্য কারো দেখা পাওয়া যায় না।

একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে এ পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে সরকার স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা না করায় এখনও আমাকে ঘুরতে হয় প্রশাসনের দরজায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ করে এমন বাংলাদেশ গড়তে আমার সন্তানতো প্রাণ দেয়নি?।

একপর্যায়ে চোখের পানি মুছতে, মুছতে শহীদ আজাদের মা ননী বেওয়া (৮৬) শেষ ইচ্ছা ব্যক্ত করে জানান, সন্তানের স্মৃতি ফলক শ্রীবৃদ্ধিসহ পুনঃসংস্কার, স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা।

এএম/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।