৫০ বছরের প্রতীক্ষার সেতু


প্রকাশিত: ০৫:০৩ এএম, ২৪ মার্চ ২০১৫

ষাটের দশকে কাপ্তাই হ্রদের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন উচুঁ কিছু টিলায়। কেউ কেউ পাড়ি জমিয়েছেন দূরদূরান্তে। কিন্তু  নাড়ির টানে যারা এই মায়ার শহর ছেড়ে কোথাও যেতে পারেননি কিংবা আর্থিক টানাপোড়েনে যাওয়ার সামর্থ্যটুকুই ছিলনা তারাই নানা বিপদ সংকুল পরিস্থিতিকে সাঙ্গ করে আশ্রয় নিয়েছিলেন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ে।

মাত্র কয়েকটি পরিবারের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ত্যাগেই বসবাসের অযোগ্য পাহাড় বাসযোগ্য হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে পাহাড়টি পরিণত হয় জনবহুল এলাকায়।  হ্রদের গর্ভে সর্বস্ব হারিয়ে অথৈ জলের মাঝে উঁচু টিলায় নিরাপদ ঠিকানা করে নেয় তারা। প্রকৃতির সাথেই যেন যুদ্ধ করে টিকে আছে বাস্তুহারা এসব মানুষ। ক্ষতিপূরণতো কপালে জুটেনি।

তার সাথে সাঙ্গ হয়েছে নানা অসঙ্গতি। না ছিল চলাচলের ভালো রাস্তা। না ছিল বিদ্যুৎ সুবিধা। উন্নয়নবঞ্চিত থাকতে হয়েছে দীর্ঘ কয়েক বছর। শহরের খুব কাছে থেকেও উন্নত শিক্ষা লাভই ছিল যেন অধরা। অনিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রাথমিক শিক্ষালাভের পরই ঝড়ে পড়তো অজস্র মেধাবী মুখ। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত থাকতে হয়েছে এলাকাবাসীকে। সময়মত চিকিৎসকেরা শরণাপন্ন হতে না পেরে অকালেই ঝড়ে পড়েছে অনেক তাজা প্রাণ।

এসব ঘটেছে শুধুই যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে।  হ্রদের গর্ভে সব হারিয়ে তাদের চাওয়া ছিল শুধু একটি ফুটওভার ব্রীজ। দীর্ঘ ৫০বছর তারা শুধু আবেদন নিবেদনই করে গেছেন। তাদের সে আকুতি আমলে নেয়নি কেউই।

অবশেষে ২০০৯ সালের ২৯ডিসেম্বর আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এলাকাবাসির অনুরোধে জেলা আওয়ামীলীগ নেতা হাজী মোঃ মুছা মাতব্বর (বর্তমান জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক) রিজার্ভ বাজার-পুরানপাড়া-ঝুলিক্কা পাহাড় সংযোগ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

২০১১-১২অর্থ বছরে নয় কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রীজটি নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু তাতে বাঁধ সাধে রিজার্ভ বাজারের ধনাঢ্য এক পরিবার। তাদের বাঁধার কারণে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি।
 
ফলে এলাকাবাসিকে আন্দোলনের পথ বেছে নিতে হয়েছিল। গঠিত হয় রিজার্ভ বাজার-পুরানপাড়া ব্রীজ বাস্তবায়ন কমিটি। আর এতে সামিল হয়ে আন্দোলনে যোগ দেন পার্শ্বস্থ তিন এলাকাবাসী। সহস্রাধিক লোকের দাবি রূপ নেয় দশ হাজার লোকের দাবিতে। সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, সমাবেশ ও স্বারকলিপি প্রদান করে এই দাবি আদায়ে সোচ্চার হয়ে উঠে হাজার হাজার নারী-পুরুষ।

তাদের এই যৌক্তিক দাবি আদায়ের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে জনপ্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

কমিটির আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আহমদ তালুকদার জানান, ২০১১-১২ অর্থ বছরে ব্রীজটি নির্মাণের জন্য উন্নয়ন বোর্ড থেকে নয় কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু শহরের প্রভাবশালী পরিবার রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য মনিরুজ্জামান মহসিন রানা ও তার পরিবারের বাঁধার কারণে কাজটি শুরু করা যায়নি। বিভিন্ন পর্যায় থেকে নানাভাবে অনুরোধ করার পরও মন গলেনি রানার। ফলে আন্দোলনের পথই বেছে নিতে হয়েছিল এলাকাবাসীর। চার এলাকার দশ হাজার মানুষের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে ব্রীজটি নির্মাণে আবারো উদ্যোগ নেয় উন্নয়ন বোর্ড।

বৃহত্তর রিজার্ভ বাজারের প্রস্তাবিত শাহ আমানত আবাসিক এলাকা হতে পুরানপাড়া ও ঝুলিক্কা পাহাড় পর্যন্ত ফুটওভার ব্রীজটি নির্মাণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আবারো প্রকল্প অনুমোদন দেয়।

প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় এগারো কোটি টাকা। ২০১৩ সালের ২৩ফেব্রুয়ারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাঙামাটি সফরকালে জেলার দশটি উন্নয়ন কাজের সাথে এই  ব্রীজটিরও ভিত বসান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের পরেই শুরু হয় ব্রীজ নির্মাণের কাজ।

২০১৩সালে ব্রীজটি নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০১৫ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো বাকি রয়েছে সিংহভাগ কাজ।

ব্রীজ বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক মোঃ আবদুল মান্নান জানান, ব্রীজটি নির্মাণ হলে চার এলাকার দশ হাজারের অধিক মানুষ উপকৃত হবে। এটি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। ব্রীজটি ২০১৫সালেই নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু কাজে যথেষ্ট ধীর গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এলাকার লোকজন কাজ চলাকালিন সময়ে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকেন। কাজের মান নিয়ে আপত্তি না থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীর গতির কারণেই কাজ যথাসময়ে এগোচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

চলতিবছর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার বলছেন কাজ শেষ করতে আরো দুই বছর সময় লাগবে। ঠিকমত কাজ করলে এতোদিন লাগার কথা না।

২৯৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও সাড়ে চার মিটার প্রস্থের এই ব্রীজটিতে ৮টি পিলার রয়েছে। পুরানপাড়া পর্যন্ত ছয়টি ও ঝুলিক্কা পাহাড় পর্যন্ত রয়েছে দুইটি পিলার।

প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার স্বপন কান্তি মহাজন জানান, এ পর্যন্ত অর্ধেকের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ আগামী অর্থ বছরের মধ্যেই শেষ হবে বলে জানান তিনি। মন্ত্রনালয়ের পর্যাপ্ত  বরাদ্দ না থাকায় কাজ এগোয়নি। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কাজের ধীর গতি সম্পর্কে এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি জানান, প্রাকৃতিক কারণে অনেক সময় সময়মত কাজ করা যায় না। তবে আন্তরিকভাবেই চেষ্টা করছি যাতে কাজটি শীঘ্রই শেষ করা যায়।

দশ হাজার মানুষের দীর্ঘ ৫০বছরের স্বপ্নের এই ব্রীজটির নির্মাণ কাজ যথাসময়ে শেষ করে শীঘ্রই তা চলাচলের উপযোগী করে দেয়া হবে এমনটাই আশা এলাকাবাসীর।

এমজেড/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।