ডিজিটাল যুগে অফলাইন থাকা নতুন ট্রেন্ড, এর উপকারিতা জানেন কি?
স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠেই অনেকেই প্রথমে ফোন হাতে নেন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব কিংবা অন্য প্ল্যাটফর্মে কী ঘটছে তা দেখার জন্য। দিনের বিভিন্ন সময়ে আবারও ফিরে আসি সেই স্ক্রিনে। কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, তা অনেক সময় বুঝতেই পারি না। কিন্তু এই অবিরাম অনলাইন উপস্থিতির মাঝেই ধীরে ধীরে বাড়ছে এক ভিন্ন ধারা ডিজিটাল ডিটক্স বা সচেতনভাবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কিছু সময় দূরে থাকার অভ্যাস।
ডিজিটাল ডিটক্স কী? ডিজিটাল ডিটক্স বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেট বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকা। এটি পুরোপুরি প্রযুক্তি ত্যাগ করা নয়, বরং প্রযুক্তির ব্যবহারকে সীমিত করে নিজের মানসিক ও সামাজিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার একটি সচেতন প্রচেষ্টা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন অনেক মানুষ সপ্তাহে একদিন বা দিনে কয়েক ঘণ্টা ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ ছুটির দিনে ফোন বন্ধ রাখেন, আবার কেউ নির্দিষ্ট সময়ের পরে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারই করেন না।অনেকে এমন মানুষদের উপর বিরক্ত হোন। চাইলেও তাদের খোঁজ পাওয়া যায় না। যেন ইচ্ছে করেই নিখোঁজ হয়েছেন।
কিন্তু কেন শুরু হলো এই প্রবণতা? ডিজিটাল ডিটক্সের ধারণা খুব পুরোনো নয়। স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার দ্রুত বাড়তে শুরু করার পরই মানুষ এর নেতিবাচক দিকগুলো বুঝতে শুরু করে। বিশেষ করে গত এক দশকে গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব এবং ঘুমের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
আরও পড়ুন
শরীরের ভঙ্গিমা দেখে ফ্যানের গতি বাড়াবে কমাবে এআই
এখন নোটপ্যাডেও পাবেন ইমেজ সাপোর্ট
এর সঙ্গে আরেকটি নতুন সমস্যা যুক্ত হয়েছে ভুয়া তথ্য এবং এআই-নির্ভর কনটেন্ট। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা ভিডিও, ছবি এবং খবর এতটাই বাস্তব মনে হয় যে অনেক সময় মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পারেন না। এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য সমাজে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি এবং মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
দিনভর নেতিবাচক খবর, গুজব বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দেখতে দেখতে অনেকেই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এই চাপ থেকে মুক্তি পেতেই অনেক মানুষ এখন সচেতনভাবে কিছু সময়ের জন্য অনলাইন দুনিয়া থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকার বেশ কিছু উপকারিতা রয়েছে। ডিজিটাল ডিটক্সের বেশ কিছু ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
প্রথমত, এটি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। যখন মানুষ কিছু সময়ের জন্য অনলাইন তথ্যের স্রোত থেকে বেরিয়ে আসে, তখন মস্তিষ্কও কিছুটা বিশ্রাম পায়।
দ্বিতীয়ত, ঘুমের মান উন্নত হয়। রাতে ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে, ফলে ঘুমাতে সমস্যা হয়। ডিজিটাল ডিটক্স এই অভ্যাস কমাতে সাহায্য করে।
তৃতীয়ত, বাস্তব জীবনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ে, কারণ মনোযোগ তখন আর ফোনের স্ক্রিনে আটকে থাকে না।
চতুর্থত, মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে। কাজের সময় সোশ্যাল মিডিয়া নোটিফিকেশন মনোযোগ ভেঙে দেয়। সেগুলো থেকে দূরে থাকলে কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ে।
এআই যুগে এটি আরও জরুরি? বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া ছবি বা মিথ্যা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলো অনেক সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করে, আতঙ্ক সৃষ্টি করে বা ভুল ধারণা তৈরি করে। ফলে অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটালে মানসিক চাপ এবং তথ্যগত বিভ্রান্তি দুটিই বাড়তে পারে।
ডিজিটাল ডিটক্স এই চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি দিতে পারে। কিছু সময়ের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকলে মানুষ নিজের চিন্তা ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন।
কীভাবে শুরু করবেন ডিজিটাল ডিটক্স? ডিজিটাল ডিটক্স শুরু করতে বড় কোনো পরিবর্তনের দরকার নেই। ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই শুরু করা যায়। যেমন- প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বন্ধ রাখা। ঘুমানোর আগে অন্তত এক ঘণ্টা ফোন ব্যবহার না করা। খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা। সপ্তাহে একদিন ‘স্ক্রিন-ফ্রি’ সময় নির্ধারণ করা। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে দেওয়া। এভাবে ধীরে ধীরে প্রযুক্তির সঙ্গে একটি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব।
কেএসকে