শিক্ষিকাকে মারধর করলেন উপজেলা চেয়ারম্যান : সরগরম চকরিয়া
কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকাকে উপজেলা চেয়ারম্যান স্ব-স্ত্রীক পেঠানোর অভিযোগে মামলার ঘটনায় সরগরম হয়ে উঠেছে চকরিয়ার রাজনৈতিক ময়দান।
কক্সবাজারের আওয়ামী রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তি চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম এমএ কে কেন্দ্র করে অভিযোগটি এখন তার রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের বলয়ের মাঝে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষিকার পক্ষ থেকে মামলা ও নানা প্রতিবেদনে সরব রয়েছে মিডিয়া। এর পেছনে জাফরের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। আর জাফর সমর্থকরা প্রতিবাদ সমাবেশসহ অভিযোগটির আসল তথ্য বের করে আনতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনে স্মারকলিপি দিয়েছে।
ফলে বিষয়টি এখন রাজনৈতিক দাবা চালের গুটি হয়ে উঠায় নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সুধী মহল আসল বিষয়টি বের করে আনতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি ও একটি স্পর্শকাতর অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক খেল না খেলতে সবার প্রতি অনুরোধ জানান।
ঘটনার ভিকটিম চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট রিংভং দক্ষিণ পাহাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হুমায়রা আজাদী।
তিনি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, ২০০৫ সালে তিনিসহ কয়েকজন নিজ টাকায় মালুমঘাট রিংভং দক্ষিণ পাহাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন বিদ্যালয়টি বেসরকারি থাকলেও এখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে চলছে। বিদ্যালয়টি বেসরকারি থাকাবস্থায় সহকারী শিক্ষিকা মালেকা বেগম ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর পানি উন্নয়ন বোর্ডে চাকরির কথা বলে স্ব-ইচ্ছায় পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বিদ্যালয় হতে চলে যান। ওই পদে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে শারমিন আক্তার কানিছকে নিয়োগ দেন স্কুল কমিটি।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সারাদেশের ন্যায় বিদ্যালয়টি সরকারি হলে নতুন করে মালেকা বেগম স্বপদে শিক্ষক ফিরে এসে বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ দায়ের করেন।
তার দাবি, গত ২৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম ও তার সহধর্মিণী শাহেদা জাফর অতর্কিতভাবে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে মালেকা বেগমকে নতুন করে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ ও যোগদানপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য তাকে (প্রধান শিক্ষিকাকে) চাপ প্রয়োগ করেন।
এ বিষয়ে তার কোনো ক্ষমতা নেই জানিয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললে উপজেলা চেয়ারম্যান ও তার সহধর্মিণী ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে টানা হেচড়া করার এক পর্যায়ে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেন। এসময় তাকে উদ্ধারে সহকারী শিক্ষিকা শারমিন আক্তার কানিছ ও প্রধান শিক্ষিকার ভাই জিয়াবুল হক এগিয়ে গেলে তাদেরকেও মারধর করা হয়। স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। এঘটনায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন।
তবে মালেকার পদত্যাগপত্র সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরে যথা নিয়মে উপস্থাপন করা হয়েছিল কিনা এসব বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলেননি হুমায়রা আজাদী।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা শিক্ষা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাফর আলম এমএ বলেন, দু’শিক্ষিকার মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসন করতে গিয়ে উল্টো মামলার আসামি হয়েছেন তিনি।
সরকারি চাকরিতে বহাল থাকার ঘটনা নিয়ে প্রধান ও সহকারী শিক্ষিকার মাঝে সৃষ্ট দীর্ঘ বিরোধের অবসান করতে তিনি চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এ ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করে প্রভাবশালী একটি মহল নেপথ্যে থেকে ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে আওয়ামী লীগ ও তার ব্যক্তি ইমেজ ক্ষুণ্ণ করতে চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার মতে, রিংভং দক্ষিণ পাহাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৫ সালে। বনবিভাগের জায়গায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হলেও সেই সময় ভূমি ও গাছ অক্ষুণ্ণ রাখার প্রতিশ্রুতিতে বনবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে বিদ্যালয়টির অবস্থান নিশ্চিত করি আমি। উপজেলা পরিষদের সার্বিক প্রচেষ্টায় প্রায় ৬ লাখ টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করে বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়। শুরুতে প্রধান শিক্ষক হুমায়রা আজাদী, বেলাল হোছাইন, ইয়াছমিন জন্নাত ও মালেকা বেগম এ চারজন শিক্ষক দায়িত্বপালন করেছে।
২০১৩ সালে বর্তমান সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ম শেখ হাসিনার নির্দেশে দেশের অপরাপর রেজিস্ট্রার সকল বিদ্যালয়ের সঙ্গে রিংভং দক্ষিণ পাহাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও জাতীয়করণ হয়।
উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিধবা মালেকা বেগম বিদ্যালয়টিতে চাকরিতে বহাল আছেন। কিন্তু বিদ্যালয়টি সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হওয়ার পর হঠাৎ করে প্রধান শিক্ষিকা হুমায়রা আজাদী মোটা অঙ্কের লেনদেনে নতুন একজন শিক্ষক নিয়োগের জন্য তোড়জোড় শুরু করে। এরপর থেকে সহকারী শিক্ষিকা মালেকা বেগমকে তিনি বিদ্যালয়ে যেতে নানাভাবে বারণ করে এবং বাধা দেয়। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে দুই শিক্ষিকার মধ্যে বিরোধ চলে আসছিলো। এসব ঘটনায় দু’জনের মধ্যে হাতা-হাতির ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে প্রধান শিক্ষিকা হুমায়রা আজাদীর মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতেও যেতে হয় সহকারী শিক্ষিকা মালেকা বেগমকে।
চকরিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমিটির সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম আরো বলেন, ২০১৩ সালে চকরিয়া উপজেলা পরিষদের শিক্ষা কমিটির সভায় দুই শিক্ষিকার বিরোধের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। তৎকালীন উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সভার সভাপতিত্ব করেন। সভার সিদ্বান্তের আলোকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ২০১৩ সালের ১৯ জুন অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের শিক্ষা কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, বিজ্ঞ আদালত অভিযোগটি তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করি নিরপেক্ষ তদন্তে প্রকৃত ঘটনা আদালতে তুলে উঠে আসবে। সত্যের জয় হবেই।
এ ব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, ঘটনার বিষয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। আদালত অতিরিক্ত জেলা মাজিস্ট্রেটকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। নিরপেক্ষ তদন্তে আসল বিষয়টি বেরিয়ে আসবে বলে মনে করি। তখন দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হবে।
সায়ীদ আলমগীর/এমএএস/এআরএস