‘হামার তিস্তা শুকিয়ে খাঁ খাঁ’
তিস্তার পানির কথা আর না কন বাহে। নদীত সব হারিয়ে এখন পথে বসেছি। পানি নিয়া হিন্দুস্থান (ভারত) যা করছে বলার মত না। হামার পানি আটকে ওমার (ওদের) লাভ কি? হামার পানি হামাক দিলে মিটি যায় (সমাধান)। এখন হামার তিস্তা শুকি খাঁ খাঁ হইছে। এভাবেই কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন তিস্তাপাড়ের বৃদ্ধ জিন্নত আলী (৫০)।
ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে সর্বনাশী তিস্তা। বড় বড় বালুর স্তুপ পরিয়ে মূল নদীর গতিপথ হারাতে বসেছে। দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের ব্যারাজটি দাঁড়িয়ে আছে বালু চরে। গত বছরের জুলাই মাসে টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে তিস্তা নদী।
ওই সময় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারাজ’ রক্ষায় খুলে দেয়া হয় ৫২টি গেট। এতে শুধু ব্যারাজের উজানের বাসিন্দারাই নন ভাটিতে থাকাও লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। নদী ভাঙনে বসত-ভিটাসহ সবকিছু হারিয়ে নিঃশ্ব হয়ে পড়েন প্রায় ৩ হাজার পরিবার।
পরিবারগুলো এখনো তিস্তা ব্যারাজের কাছে সিলড্যাপে আশ্রায় নিয়ে আছেন। অথচ মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে সেই তিস্তা এখন ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে।
এতে করে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের আওয়তায় থাকা রংপুর-দিনাজপুরের লাখ লাখ কৃষক তাদের বোরো চাষ নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় একদিকে যেমন বর্ষা মৌসুমে ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নিঃশ্ব হচ্ছে তেমনি শুস্ক মৌসুমেও তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে ভারত তাদের গোজল ডোবা নামে বাঁধের সাহায্যে একতরফাভাবে পানি আটকিয়ে বাংলাদেশের উত্তর জনপদের লাখ লাখ কৃষকের বোরা চাষাবাদ ব্যাহত করছে। ফলে দিনে দিনে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পটি।
এই অবস্থায় পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করে তিস্তা নদী বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজাপুরসহ সেচ নির্ভর মানুষজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতিবছর শুস্ক মৌসুমে যে হারে পানি প্রবাহ কমে আসছে তাতে করে শিগগিরিই কাঙ্ক্ষিত পানি চুক্তি সম্পন্ন না হলে, মরা খালে পরিণত হতে পারে বহুল আলোচিত তিস্তা নদী। আর সেইসঙ্গে তিস্তা নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা উত্তর জনপদের জীব বৈচিত্র মারত্বক হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, তিস্তা ব্যারাজের মোট ৫২টি গেটের মধ্যে ৪৫টি বন্ধ করে উজানের পানি আটকানোর চেষ্টা করছেন কর্তৃপক্ষ। এতে করে যেটুকু পানি উজানে জমছে তাতেই ব্যারাজটির বাকি ৭টি গেটের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে পানি প্রবাহ মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার কিউসেকে ওঠানামা করায় সেচের লক্ষ্যমাত্র ব্যহত হওয়ার আশঙ্কা করছে।
তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মতে, ২০১৪ সালে রংপুর দিনাজপুরে ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ওই বছর পানির অভাবে ১৮ হাজার হেক্টর জামিতে সেচ দেয়া হয়। আর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে তা আরও কমিয়ে মাত্র ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া হয়। এবছরও পানি সঙ্কট দেখা দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
হাতীবান্ধা উপজেলার ধুবনী গ্রামের তিস্তা চরের কাশেম আলী (৫০) জানান, তিস্তায় পানি না থাকায় ভুট্টা ক্ষেতে সেচ দিতে পারছেন না। তাই ভুট্টা ক্ষেত বাঁচাতে বিকল্প সেচের ব্যবস্থা করছেন।
তিস্তা সেচ প্রকল্পের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী বলেন, তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের আওতায় গত ১৫ জানুয়ারি থেকে সেচ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। পানি স্বল্পতার কারণে সেচ সুবিধার লক্ষ্যমাত্র হিসেবে এবছর ৮ হাজার হেক্টর জমি ধরা হয়েছে।
তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, তিস্তায় পানি প্রবাহ বাড়লে সেচ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলসহ সেচের আওতা বাড়বে।
এফএ/এমএস