সেই দিনের স্মৃতি মনে হলে গা শিউরে ওঠে


প্রকাশিত: ০৩:২৮ পিএম, ২৬ মার্চ ২০১৭

প্রচণ্ড শীতে খালি গায়ে অস্ত্রটি হাতে নিয়ে থর থর করে কাঁপছিলাম মুক্তি ক্যাম্পে। রাত গভীর হতে শুরু করেছে। একটু চোখ বুজতেই চারদিক থেকে গুলি আসতে শুরু করলো। মনে হলো এবার বুঝি আর রক্ষা নেই।

মনোবল না হারিয়ে প্রচণ্ড শীতে সামনে ও পিছনে গুলি চালাতে থাকি। হঠাৎ পিছন দিক থেকে সহপাঠি আইনুলের পিটে গুলি লাগে। মুহূর্তে চোখের সামনে আইনুল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে একে একে চারজন সহপাঠি মৃত্যু মিছিলে সামিল হন।

সেই দিনের ভয়াল স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। সেই দিনের স্মৃতি কথা মনে হলে গা শিউরে উঠে। সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আজও বেঁচে আছি। এভাবে কথাগুলো বলছিলেন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলা সহকারী কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম।

তিনি আরও বলতে থাকেন, সবেমাত্র মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছি। পরীক্ষা শেষে ঢাকা বেড়াতে গিয়ে ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে রেসকোর্স মাঠে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে অন্তরে গেঁথে রাখি। সেই ভাষণ হৃদয়ে ধরণ করে ৫ মে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে জন্য ভারতের শীতলকুশী ক্যাম্পে রওনা হই। ভারতের মুজিব ক্যাম্পে টানা ১ মাস ২২ দিন ট্রেনিং করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে রেডিও মাধ্যমে জানতে পারি ২৫ মার্চে রাতে পাক-বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ শিক্ষকসহ দুই শতাধিক ছাত্র-কর্মচারী হত্যা করে। আর নিরীহ বাঙালীর ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করে। এতে হাজার হাজার জনতা অকাতরে জীবন হারান।

Freedom

এর মধ্যে খবর এলো হানাদার বাহিনী ট্রেনে করে লালমনিরহাট শহর হয়ে হাতীবান্ধা আক্রমণ করতে আসছে এমন খবরে এলাকার মানুষ সবাই সীমান্তের দিকে ছুটে পালাতে থাকে। পরের দিন বাঙালী ইপিআরদের হত্যা করতে শুরু করে পাক-হানাদাররা। হাতীবান্ধা সিন্দুর্না এলাকার নমরউদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী লালমনিরহাট শহরে গেলে তাকেও হত্যা করা হয়।

তিনি আরও জানান, দেশকে স্বাধীন করার জন্য আমরা দুই ভাই, মা-বাবাকে ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। জীবনবাজী রেখে পাক-হানাদার বাহিনীর ওপর অবিরাম গুলি চালায়। আমার বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হকের সঙ্গে ৬ মাস ১৩ দিন পর দেখা হয়।

বড় ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, দাদা আমাদের কথা ভাবতে ভাবতে মারা গেছেন। আমি কেঁদে ফেলি ভাই আমাকে বলে তুই কাঁদিস কেন আমার চোখে তো পানি নেই।

৫ মে ১৯৭১ সালে আমি অন্য অন্য লোকজনের সঙ্গে ভারতের শীতলকুশী ক্যাম্পে যায়। ওই ক্যাম্পের সংগঠক ছিলেন  ইঞ্জিনিয়ার নজরুল ইসলাম, নুরুজ্জামান বিএসসি। মুজিব ক্যাম্পে আমারা ১ মাস ২২ দিন ট্রেনিং করি।

এসময় আমার মুক্তিযোদ্ধা প্লাটনের হেড ছিল ডাউয়াবাড়ি সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম। আমাদের প্লাটনকে প্রথমে সোনার হাট, বাংলাবান্ধা পরে জগদল এলাকায় যুদ্ধকালী সময়যুদ্ধ করতে হয়েছে।

কুড়িগ্রাম সোনারহাটে যুদ্ধে ক্ষেত্রে চারজন, জগদহে একজন শহীদ হন। ৪ ডিসেম্বর হাতীবান্ধা সিংঙ্গীমারী বিওপি ক্যাম্পে কাছে যুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধা রংগু ও ফজলল হক শহীদ হন। ৫ ডিসেম্বর হাতীবান্ধা ও ৬ ডিসেম্বর লালমনিরহাট জেলা হানাদার মুক্ত হয়।

রবিউল হাসান/এআরএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।