ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৩৭ এএম, ১৪ মার্চ ২০২৬
প্রতীকী ছবি (এআই দিয়ে বানানো)

পরমাণু আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর জবাবে ইসরায়েল ও পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এর জেরে ওই অঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, যার প্রভাব পড়েছে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা দ্য গার্ডিয়ার বলছে, এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বিপদে অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

এরই মধ্যে এই যুদ্ধের ফলে হঠাৎ জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া ও খাদ্যপণ্য থেকে স্মার্টফোন- প্রায় সবকিছুর দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই বলা-ই যায় যে এই সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছে।

এরই মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে ভোক্তারা এর প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছেন। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ঘোষণা দিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তার এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ করিডর হিসেবে পরিচিত। তাই মোজতবা খামেনির ঘোষণায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল মজুত ছাড়ের ফলে যে সাময়িক স্বস্তি এসেছিল, তা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে গেছে।

আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর হামলা জোরদার করেছে, তখন ইরানও উপসাগরজুড়ে পরিবহন অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের উৎপাদন ও পরিবহনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্বজুড়েই।

তবে এই অর্থনৈতিক ধাক্কা বিশ্বের সব অঞ্চলে সমানভাবে পড়ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের কারণে সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই কারণে পাকিস্তানেও কিছু স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো মূলত দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রভাব নিয়ে বেশি আলোচনা করছে, সেখানে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল অনেক বড় মূল্য দিচ্ছে। আর এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশ্বের দরিদ্র ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী।

নতুন মানবিক সংকট

এই যুদ্ধ একটি নতুন মানবিক সংকট তৈরি করেছে। ইরান ও লেবাননে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৭ হাজারেরও বেশি আবাসিক ভবন ধ্বংস হয়েছে।

এদিকে, এই সংঘাত আগের থেকেই চলমান মানবিক সংকটগুলোকে আরও গভীর করে তুলছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা কমানো ও যুক্তরাজ্যসহ অন্য কিছু দেশের সাহায্য হ্রাসের কারণে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ আরও তীব্র খাদ্য সংকটে পড়ছে।

গাজার মতো ধ্বংসপ্রায় অঞ্চলে খাদ্যের দাম বাড়ছে। ইসরায়েল সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়ার পর সেখানে খাদ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা এখন অঞ্চল থেকে জরুরি ত্রাণ পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছে।

কারণ দুবাইয়ে রয়েছে একটি বড় মানবিক ত্রাণ সরবরাহ কেন্দ্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম কনটেইনার টার্মিনাল। একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর তার ধ্বংসাবশেষ ওই বন্দরে পড়ে আগুন লাগার পর টার্মিনালটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফলে পরিবহন কোম্পানিগুলো জরুরি অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করছে, যা প্রতি কনটেইনারে প্রায় ৩ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, এই সংকটের কারণে ভারত থেকে সুদানে ত্রাণ পাঠানোর পথ ৯ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

সুদান বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের মুখে রয়েছে। ত্রাণ কার্যক্রমেও ব্যয় বাড়ছে। তেলের দামের ধাক্কা শুধু ত্রাণ পরিবহনের খরচ বাড়াচ্ছে না, বরং হাসপাতাল ও ক্লিনিকের জেনারেটর চালানোর খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সুদানের প্রায় অর্ধেক সার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যেসব দেশ এমন বিদেশি সার কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাদের খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব পড়বে।

এছাড়া অনেক দেশ বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। কারণ ধনী বিদেশিদের মতো তারা উপসাগরীয় অঞ্চল ছেড়ে পালাতে পারছে না, আবার পর্যাপ্ত কাজও পাচ্ছে না।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস থিঙ্কট্যাংকের গবেষক স্যাম ভাইগেরস্কি সতর্ক করে বলেছেন, একটি নতুন ‘পলিক্রাইসিস’ তৈরি হচ্ছে, যা ক্ষুধার্ত মানুষদের জরুরি অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে ও যারা এরই মধ্যে জরুরি অবস্থায় থাকা জনগোষ্ঠীকে দুর্ভিক্ষের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তার মতে, কোটি কোটি মানুষের জন্য এই অর্থনৈতিক ধাক্কা শুধু আর্থিক সংকট নয়, বরং জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে মানবিক ত্রাণবাহী কনভয় চলাচলের নিরাপদ পথ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে আকাশপথে চলাচলের বিধিনিষেধের মধ্যে জরুরি পণ্য পরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

তবে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হলো এই বিপর্যয়কর ও অবৈধ যুদ্ধের অবসান ঘটানো।

যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা অন্তত সম্মিলিতভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দ্রুত যুদ্ধ থেকে সরে আসার জন্য চাপ দেওয়ার কিছু ক্ষমতা রাখেন, কারণ তারাই এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য পরিশোধ করছেন। তবে বাস্তবে এই সংঘাতের স্থায়ী সমাপ্তি ঘটানো আরও কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে, বিশ্বের বহু মানুষ, যারা আরও বড় অর্থনৈতিক দুর্ভোগের মুখে পড়েছে, তাদের কাছে অপেক্ষা করা ও কষ্ট সহ্য করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এসএএইচ/এসআর

 

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।