লোকালয়ে জোয়ার-ভাটায় দুর্ভোগ চরমে
কক্সবাজার সদরের পোকখালী ইউনিয়নের উপকূলীয় গোমাতলীবাসীর দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে ভেঙে যাওয়া বাঁধ সংস্কার না হওয়ায় শুক্রবার থেকে আবারো লোকালয়ে জোয়ার-ভাটা চলছে। পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় দেড় হাজার একর লবণ মাঠ। এতে ক্ষয়ে গেছে প্রায় কোটি টাকার লবণ।
শুধু লবণ মাঠ নয়, পানিতে ডুবে আছে চলচলের রাস্তা। এতে পানিবন্দি হয়ে আছে ঘর-বাড়ি, শিক্ষা, ধর্মীয় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফলে নতুন করে আবারো দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থীসহ বৃহত্তর গোমাতলীর ২৫ হাজার মানুষ।
বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী চ্যানেলের পূর্বাংশে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ৬ নম্বর স্লুইচ গেইট এলাকায় এ ভাঙনটি এক বছরেও পূর্ণ মেরামত সম্ভব না হওয়ায় এ ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে স্থানীয় ও লবণ চাষিদের।
গোমাতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রশিদ আহমদ ও নজরুল ইসলাম জানান, পোকখালী ইউনিয়নের পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর গোমাতলী মহেশখালী চ্যানেলের পূর্বাশ বেড়িবাঁধ দারা রক্ষিত উপকূল। এ তিন গ্রামে ২২টি চিংড়ি ঘেরের আওতায় প্রায় ১০ হাজার একর লবণের মাঠ রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এসব মাঠে পুরোদমে লবণ চাষ ও বর্ষায় বাগদা চিংড়ি চাষ হয়ে থাকে।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে ক্ষতবিক্ষত হয় উপকূল রক্ষা বাঁধটি। এরপর থেকে চলতি সময় পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত বেঁড়িবাধ ও স্লুইচ গেটগুলো টেকসইভাবে সংস্কার করা হয়নি। জোড়াতালি দিয়ে কোনো মতে চলে আসলেও বিগত বছরের বর্ষার শুরুর দিকে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে বেড়িবাঁধের ৬ নম্বর স্লুইচগেট এলাকার উত্তরাংশ ভাঙনের কবলে পড়ে। যা ধীরে ধীরে বড় ও গভীর হয়েছে।
লবণ চাষি ও গোমাতলী মোহাজের উপনিবেশ সমিতির নেতা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভাঙন মেরামতে সরকারি বরাদ্দ আসতে দেরি হচ্ছে দেখে ঘের মালিকদের চাঁদায় অর্ধকোটি টাকার মাটি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের পর ভাঙনটির মেরামত প্রায় শেষ পর্যায়ে আনা হয়েছিল। তখন কয়েক হাজার একর মাঠে লবণ চাষ হয়। শুষ্ক মৌসুমে জোয়ারের বেগ কম থাকায় লবণ উৎপাদনে বেগ পেতে হয়নি।
কিন্তু বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ মেরামত করা ভাঙনটি আবার তলিয়ে গিয়ে পুরো গোমতলী পানিতে ডুবে যায়। এতে প্রায় দেড় হাজার একর মাঠের লবণ পানিতে মিলিয়ে গেছে।
পোকখালী ইউপির স্থানীয় সদস্য মোহাম্মদুল হক দুখুমিয়া বলেন, লবণের মাঠের পাশাপাশি পানিতে ডুবে রয়েছে সড়ক-উপসড়ক ও শিক্ষা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি ঘর। ফলে প্রান্তিক লবণ চাষিরা এখন চোখে সরষে ফুল দেখছেন।
পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন গুলোতে পুরোদমে লবণ উৎপাদন চললেও ভাঙনের দুর্ভোগ অনেক চাষিকে পুরনো পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য করছে।
লবণ চাষি আবদুর রহমান, জালাল আহমদ, নুরুল হক বলেন, গত ১৫-১৬ অর্থবছরে লবণের ন্যায্য দাম পাওয়া ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় অন্যান্য এলাকার চাষিরা লাভবান হয়েছে। কিন্তু গোমাতলীতে রোয়ানুর প্রভাব এখনো থামেনি। ফলে বর্তমানেও জোয়ার-ভাটায় চলছে দৈনন্দিন জীবন।

ইউপির পশ্চিম গোমাতলী এলাকার সদস্য আলাউদ্দিন জানান, জোয়ারের পানির কারণে উত্তর গোমাতলী, আজিমপাড়া, কাটাখালী ও রাজঘাট এলাকার কয়েক হাজার মানুষ আবারো দুর্ভোগে পড়েছে। বসতঘর ও শিক্ষা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ছে পানি। পাউবোর ৬৬/৩ নং পোল্ডারে ২শ মিটার ভাঙনটিই এলাকার লোকজনকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। হুমকিতে রয়েছে মসজিদ-কবরস্থানও।
গোমাতলী সমবায় কৃষি ও মোহাজের উপনিবেশ সমিতির সভাপতি নুরুল আমিন বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকায় কংক্রিটের ব্লক বসিয়ে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না গেলে ৬৬/৩ পোল্ডারের আওতায় বিশাল এলাকা নিকট ভবিষ্যতে সাগরে তলিয়ে যাবে।
পোকখালী ইউপির চেয়ারম্যান রফিক আহমদ জানান, গোমাতলীবাসীর দূর্ভোগ লাঘবে পাউবোর কাছে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু অদ্যবধি কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের কিছু কিছু অংশ সংস্কারে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দুর্ভোগে পড়া জনগণ টেকসই বাধ, স্লুইচ গেট ও সড়ক সংস্কারে বরাদ্দ পেতে সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন পাঠানো হয়েছে।
এফএ/পিআর