নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল গণহত্যা দিবস আজ


প্রকাশিত: ০৭:৩৯ এএম, ০৫ মে ২০১৫

আজ ৫ মে মঙ্গলবার। লালপুর উপজেলার নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদার বাহিনী সুগার মিল অবরুদ্ধ করে তৎকালীন প্রশাসক এবং ৪২জন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শতাধিক লোককে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে।

স্বাধীনতার পর শহীদদের সলিল সমাধির নীরব স্বাক্ষী গণহত্যাস্থলের পুকুরটির নামকরণ করা হয় ‘শহীদ সাগর’। লালপুরবাসীর জন্য এটি একটি স্মরণীয় দিন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সারাদেশে উৎপাদন যন্ত্র অচল থাকলেও হানাদার বাহিনীর নাটোর ক্যাম্পের মেজর শেরওয়ানী খানের আশ্বাসে এলাকার আখ চাষীদের স্বার্থ বিবেচনা করে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের তৎকালীন প্রশাসক লে. আনোয়ারুল আজিম যথারীতি মিলের উৎপাদন অব্যহত রাখেন। কিন্তু হানাদার মেজর তার ওয়াদা ভঙ্গ করে। বর্বর পাকবাহিনী মিলের সবগুলো গেটে তালা লাগিয়ে শতাধিক বাঙ্গালিদের সনাক্ত করে মিলের ১ নং গেট সংলগ্ন পুকুর ঘাটে নিয়ে যায়। তাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে লাশগুলো পুকুরে ফেলে দেয়। ওই দিনই হানাদার বাহিনী গোলাপপুর বাজার এলাকায় আরো ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে। সেদিন মিলের হত্যাযজ্ঞে যেন কোন অবাঙ্গালি মারা না পড়ে সেজন্য তাদের সবার মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা হয়।

পাক হানাদার বাহিনীর লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞের নীরব স্বাক্ষী কয়েকজন। তারা বুলেটবিদ্ধ হয়ে লাশের স্তুপের নিচে চাপা পড়েও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তাদের একজন হলেন খন্দকার জালাল আহমেদ।

তিনি সেই বিভিষীকাময় ভয়াবহ দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, ১৯৭১ সালে ৫ মে। আনুমানিক সকাল সাড়ে দশটা। ডিউটি করছি। দুজন পাক সেনা আমার দু`পাশে এসে দাঁড়ালো। একজন পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে বললো, ‘ইয়ে বাঙ্গালি চলো, মিটিং হোগা, মিটিং মে চলো’। এসময় মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা মঞ্জুর ইমান নামে একজন অবাঙ্গালি কর্মচারী বাঙ্গালিদের সনাক্ত করে দিচ্ছিল। এদিকে মিলের প্রশাসক আনোয়ারুল আজিমসহ অন্যান্যদের ধরে এনে মাটিতে বসিয়ে রাখে।

একজন পাক অফিসার আজিম সাহেবকে লক্ষ্য করে বলে, ‘কিসনে মেজর আসলামকে মারা হায়’? তিনি বলেন, জানিনা। আমাদেরকে অফিসার্স কোয়ার্টারের পুকুর ঘাটে নিয়ে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। তখনই বুঝতে পারলাম নিশ্চিত মারা যাচ্ছি। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘাতকদের ১৩টি স্বয়ংক্রিয় এলএমজি এক সঙ্গে আমাদের ওপর গর্জে উঠে। গগনবিদারী চিৎকারে আকাশ-বাতাসে আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে।

মুহুর্তের মধ্যে পুকুর ঘাট লাশের স্তুপে পরিণত হয়। তাজা রক্তের স্রোতে পুকুরের পানি হয়ে যায় রক্ত রাঙা। নিস্তব্ধ হয়ে যায় প্রকৃতি। মৃত্যু নিশ্চিত করতে বেয়ানেট দিয়ে খুঁচিয়ে পানির মধ্যে গড়িয়ে দেয়। এক সময় জ্ঞান ফিরে দেখি আমার মাথাটা সানের ওপর এবং দেহের অর্ধেক অংশ রক্তে রঞ্জিত পানির মধ্যে ডুবে আছে। লাশের স্তুপের মধ্যে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে জীবন্ত কাউকে খুঁজে ফিরেছে আমার এক সহকর্মী মেহমান আলী। বুঝলাম তিনিই আমাকে লাশের স্তুপের মধ্যে থেকে উদ্ধার করেছেন। বহু কষ্টে উঠে বসতেই দেখতে পেলাম পাশে পড়ে আছে ছোট ভাই মান্নানের লাশ। সে বিভৎস্য দৃশ্যের কথা মনে হলে আজও শিউরে উঠি, গায়ে কাঁটা দিয়ে লোম খাড়া হয়ে উঠে।

শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে শহীদ সাগর চত্ত্বরে স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালের ৫ মে মিলের প্রশাসক লে. আনোয়ারুল আজিমের স্ত্রী বেগম শামসুন্নাহার শহীদ সাগর চত্ত্বরে স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন। তার নামানুসারে গোপালপুর রেল স্টেশনের নামকরণ হয়েছে আজিমনগর স্টেশন। শহীদ আজিমের ছেলে প্রজন্ম একাত্তরের একজন সক্রিয় কর্মী। এছাড়া ২০০০ সাল থেকে দিনটিকে বাংলাদেশের চিনিকলসমূহের শহীদ দিবস হিসেবে দেশের সবকটি চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীরা পালন করছে। প্রতিবছর শহীদদের আত্নীয়-স্বজন, মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় লোকজন ৫ মে শহীদ সাগরে সমবেত হন।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল কর্তৃপক্ষ শহীদদের স্মরণে মঙ্গলবার সকালে ফাতেহা পাঠ ও পুস্পস্তবক অর্পণ, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল, কাঙালী ভোজ ও খতমে কোরআন কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

এসএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।