৪শ একর ভূমি হারানোর শঙ্কায় পাল­াতল সীমান্তবাসী


প্রকাশিত: ০৮:৪০ এএম, ১০ মে ২০১৫

ভারতের লোকসভায় স্থলসীমান্ত চুক্তি বিল পাস হওয়ার খবরে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পাল­াতল সীমান্তের আদিবাসীরা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন। নিজেদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উৎস পানজুমসহ নিজ ভূমি ভারতের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় উৎকণ্ঠিত সীমান্তবাসীরা। এই সীমান্তের প্রায় ৪০০ একর জায়গা বাংলাদেশের অপদখলে রয়েছে।

এলাকাবাসী এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, পাল­াতল সীমান্তের ১৩৭০ নম্বর প্রধান খুঁটির ১ নম্বর উপখুঁটি থেকে ১৩৭৪ নম্বর প্রধান খুঁটির ১ নম্বর উপখুঁটি পর্যন্ত প্রায় ৩৬০ একর জায়গা বাংলাদেশের অপদখলে রয়েছে। এর বিপরীতে ভারতের আসামের করিমগঞ্জ জেলা।

৩৬০ একরের ভেতর শতবর্ষী পাল­াতল চা-বাগান ও পাল­াতল পুঞ্জি (পুঞ্জিতে আদিবাসী খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস) পড়েছে। দুটি স্থানে প্রায় তিন হাজার লোকের বাস। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে সীমান্তে যৌথ জরিপ দল কাজ শুরু করে। এসময় অপদখলীয় বেশিরভাগ জায়গা ভারতকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে এ খবরে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এলাকাবাসীর বাধায় ২০১১ সালের ২৮ আগস্ট যৌথ জরিপ দলটি ফিরে যায়। জায়গাটি রক্ষার দাবিতে এলাকাবাসী বিক্ষোভ করেন। এরই একপর্যায়ে জরিপ কাজ শেষ হলে ২০১১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পাল­াতলের নির্দেশক মানচিত্রে (ইনডেক্স ম্যাপ) যৌথ জরিপ দল স্বাক্ষর করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রটৗেকল স্বাক্ষরিত হয়।
 
স্থানীয় পুঞ্জির বসবাসরত আদিবাসীসহ বিভিন্ন সূত্র জানান, নির্দেশক মানচিত্রে পাল­াতল সীমান্তের ১৩৭০ নম্বর প্রধান খুঁটির ৩ নম্বর উপখুঁটি থেকে ১৩৭১ নম্বর প্রধান খুঁটির ৬ নম্বর উপখুঁটি পর্যন্ত ৫৭ একর এবং ১৩৭২ নম্বর প্রধান খুঁটি থেকে এর ২ নম্বর উপখুঁটি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ৫ একর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দেখানো হয়। বাকি জায়গা দেখানো হয় ভারতের সীমানায়। এ চুক্তিতে বাংলাদেশ পাল­াতল এলাকায় ৩৬০ একর ভূমির মধ্যে মোট ভূমি পাবে ৭৪.৫৪ একর।

শুক্রবার সরেজমিনে পাল­াতল সীমান্ত এলাকায় গেলে স্থানীয় আদিবাসীদের চোখে-মুখে ভূমি হারানোর আতঙ্ক ও আশঙ্কার ছাপ লক্ষ্য করা যায়। নিজেদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উৎস পান জুমসহ ভূমি ভারতের হাতে চলে যাওয়ার শঙ্কায় তারা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন।

জাগো নিউজের সঙ্গে কথা হয় পান জুমে কর্মরত শ্রমিক ওয়ারলেস, কিরণ, স্বপন, মলের সঙ্গে। তারা জানান, এখানকার আদিবাসী প্রায় ৩০০ খাসিয়া পরিবারের মধ্যে ভারতীয় উচ্ছেদ আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ চুক্তিতে বাংলাদেশের দখলে থাকা খাসিয়াপুঞ্জি, কয়েকটি খ্রিস্টান কবরস্থান, একটি মাজারসহ অনেক জমি হাতছাড়া হয়ে হবে।

তারা আরও জানান, পাহাড়ি ভূমি শত শত বছর ধরে (বৃটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমল থেকে) বংশ পরম্পরায় বাঙালি খাসিয়ারা এদেশের ভূমি হিসেবে ভোগদখল করে আসছে। কোনোদিন জরিপ হয়নি। বিএসএফ ভারতের ভূমি বলে কোনোদিন দাবিও করেনি। এসব ভূমিতে পানসহ জুম চাষ করে আমরা জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। তাতে রয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষের শত শত কবর, আছে কালা শাহ নামে একজন পীরের মাজার ও কয়েকটি গির্জা। এ চুক্তিতে এসব আমাদের হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরী হয়েছে।

পাল­াতল পুঞ্জির মন্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) লুকাস বাহাদুর জাগো নিউজকে বলেন, পত্রিকা ও টেলিভিশনের খবরে জেনেছি, সীমান্ত বিল লোকসভায় পাশ হয়েছে। এ নিয়ে পাল­াতলের আদিবাসীরা চিন্তায় পড়েছেন। এত মানুষ কোথায় যাবেন, কী করে খাবেন? জানি না ভাগ্যে কী আছে। তবে প্রাণ গেলেও আমাদের দখলি ভূমি আমরা ছাড়বো না। জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উৎস পান জুমসহ ভূমি চলে গেলে আমাদের রাস্তায় নামতে হবে।

এ ব্যাপারে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ আমিনুর রহমান জাগো নিউজকে জানান, চুক্তির বিষয়ে সরকারিভাবে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। এ বিষয়ে স্থানীয় আদিবাসীরা তাদের কোন দাবি জানাননি। তবে আদিবাসীরা তাদের দাবি ও অনুভূতির বিষয়ে লিখিত আবেদন করলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

ছামির মাহমুদ/এমজেড/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।