পায়রায় কুমির আতঙ্কে মাছ ধরা বন্ধ
‘গাঙ্গে কুমইর আইছে, হেই ডরে এহন কেও মাচ দরতে যাই না মোরা, হেদনাগো (সেদিন) একটারে নায়তে গোনে (নৌকা থেকে) টাইন্না নেওয়া দেল্লে। অল্ফরে জন্য বাইচ্চা গ্যাছে। কুমইরের লইগ্যা এ্যাহন মোগো খাওন-দাওনই প্রায় বন্দ।’ কুমির নিয়ে এমন আতংকের কথাগুলো বলছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার পাঁচাকোড়ালিয়া ইউনিয়নের জয়ালভাঙ্গা গ্রামের প্রান্তিক জেলে সিরাজ ফরাজী (৩৫)।
স্থানীয় অধিবাসী, জন প্রতিনিধি ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরগুনার তালতলী উপজেলার ছোট বগী ইউনিয়নের গাবতলী এলাকায় গত শনিবার (২৭ মে) দুপুরে স্থানীয় জেলে আলমগীর শিকদার নৌকা আর জাল নিয়ে পায়রা নদীতে যান মাছ শিকার করতে।
তিনি নদীতে জাল ফেলার সময় একটি কুমির নৌকায় তার উপর হামলা করে। পরে তিনি জাল ফেলে নৌকা নিয়ে তীরে এসে অন্য জেলেদের এ ঘটনা বলেন। কিন্তু সুদীর্ঘ বছর ধরে এই নদীতে কুমিরের উপস্থিতি ও উৎপাত না থাকায় বিষয়টিকে বানোয়াট ও জেলেদের ভয় দেখানোর আখ্যা দিয়ে অবিশ্বাস করেন সবাই।
পরে ওইদিন দুপুরে পায়রা নদীর তীরের গাবতলী আবাসনে বাসিন্দা নাসিমা ও রাব্বি নদীতে পানি আনতে গেলে এক সঙ্গে চারটি কুমির নদীতে ভাসতে দেখেন। পরে নদী থেকে পানি না তুলে ফিরে আসেন তারা। এরপর রোববার একই উইনিয়নের মৌপাড়ার জেলেরা নদীতে জাল ফেলতে যায়। এসময় জেলেদের একটি নৌকার আবারও হামলা করে কুমির। এতে অল্পের জন্য রক্ষা পান জেলে আলম হোসেন।
এ ঘটনার পর মঙ্গলবার বিকেলে চন্দনতলা গ্রামের মোস্তফা বয়াতির ছেলে হেলাল বয়াতি তালতলীর বগী বাজারের নদীর তীরের ব্লকের কাছে গেলে তিনিও একটি কুমিরকে ব্লকের পাশে ভাসতে দেখেন। এসময় তিনি কুমির দেখার জন্য উপস্থিত স্থানীয়দের খরব দিলে, এ খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পরে আশপাশে। শতাধিক মানুষ নদী তীরে ছুটে এসে কুমির ভাসতে দেখেন। পায়রা নদীতে শতাধিক মানুষের সচক্ষে ভসমান অবস্থায় কুমির দেখার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্কে পায়রা নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দেয় জেলেরা।
এমনিতেই ভৌগলিক কারণে পিছিয়ে তালতলী উপজেলা। মাছ শিকার ছাড়া এ এলাকায় নেই বিকল্প কোনো পেশা। তার উপর কুমিরের আতংকে হঠাৎ করে জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ করে দেয়ায় হুমকিতে পড়েছে পায়রা নদীর দু’পাড়ের মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা প্রায় দুই সহস্রাধিক জেলে।
পাচাকোড়ালিয় ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, কুমিরের আতংকে বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে পঁচাকোড়ালিয়া ইউনিয়ন পর্যন্ত পায়রা নদীর প্রায় ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীর দু’পাড়েই মাছ শিকার বন্ধ করে দিয়েছে জেলেরা। প্রান্তিক জেলেদের আয়ের একমাত্র উৎসই হচ্ছে মাছ শিকার। বর্তমানে মাছ শিকার বন্ধ থাকায় অর্থ কষ্টে ভুগছে জেলেরা। হুমকির সম্মুখীন হয়েছে জেলেদের জীবন-জীবিকাও।
পঁচাকোড়ালিয়া ইউনিয়নের মোনসাতীল এলাকার জেলে হারেস বলেন, যখন মাছ ধরারা জন্য নদীতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকে, তখন জেলেদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সরকারি সহযোগিতা করা হয়। কিন্তু কুমিরের আতংকে এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না। সবাই রমজানে ভালো খাবার খেয়ে রোজা রাখলেও মাছ শিকার করতে না পারায় আমাদের দু’বেলা দু’মুঠো খাবার যোগানোই এখন দায়।
পাঁচাকোড়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নজির হোসেন কালু পাটোয়ারী বলেন, একসময় এই নদীতে কুমিরের অবাধ বিচরণ থাকলে তখন জেলেদের মাঝে এমন আতংক ছিল না। সম্প্রতি তালতলীর ইকোপার্কে কুমিরের হামলায় এক দর্শনার্থী নিহত হয়। এ ঘটনার পর থেকেই এ এলাকার মানুষের মাঝে কুমির নিয়ে আতংক সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে বরগুনার মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. ওয়াহেদুজ্জামান বলেন, পায়রা নদীতে কুমির ঢুকে পড়ার কথা আমরা শুনেছি। বঙ্গোপসাগর থেকে কুমিরগুলো নদীতে ঢুকে পড়েছে বলে আমাদের ধারণা। কুমিরগুলোকে ধরে ফেলা যায় কিনা সে জন্য বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আর জেলেরা যাতে কুমিরগুলো মেরে না ফেলে সেজন্যও তাদের সতর্ক করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটির মাধ্যমে বিষয়টিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পায়রা নদীতে কুমির ঢুকে পড়ার বিষয়ে অবগত নন বলে জানান বরগুনার ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা মো. সোলায়মান হাওলাদার। তবে আর তালতলী উপজেলা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সামছুদ্দোহা বলেন, পায়রা নদীতে কুমির ঢুকে পড়ার সংবাদ তিনি মৎস্য বিভাগের মাধ্যমে শুনেছেন। নদীতে কুমির থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
এক সময়ে দেশের ছোট ছোট খালগুলোতেও কুমিরের অবাধ বিচরণ ছিল স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, কুমিরগুলোকে যাতে উত্যক্ত না করা হয় সে বিষয়ে সকলকে সচেতন করা দরকার।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নদী থেকে কুমির ধরা সম্পূর্ণ বেয়াইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই নদী থেকে কুমিরগুলো ধরার প্রশ্নই আসে না। এতে কুমিরগুলো ক্ষিপ্ত হয়ে সাধারণ মানুষের উপর হামলার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক ড. মহা. বশিরুল আলম বলেন, পায়রা নদীতে কুমির আসার খবর আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেজবুকের মাধ্যমে জেনেছি। বর্তমান সময়ে নদীতে কুমির আসার সংবাদ আসলেই আতংকের।
কতগুলো কুমির নদীতে এসেছে এবং সেগুলোকে ধরে ফেলা যায় কিনা সে বিষয়ে মৎস্য এবং বন বিভাগের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। শিগগিরই এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
এফএ/পিআর