দৌলতপুরে ৪২ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে ভাতা নেয়ার অভিযোগ
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ৪২ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া পরিচয়ে ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, রণাঙ্গনে সম্মুখ লড়াইয়ে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর গ্রামের কুব্বাত আলী দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অবিবাহিত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে মারা যান। তবে তার স্ত্রী পরিচয়ে প্রাগপুর গ্রামের তহমিনা খাতুন নামে এক নারী নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা উত্তোলন করছেন। আবার বয়স পূর্ণ না হলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা তুলছেন বৈরাগীরচর গ্রামের নজরুল ইসলাম।
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, দৌলতপুর উপজেলায় ৪২ ব্যক্তি নানা কৌশলে মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে নাম তুলে ভাতা ভোগ করছেন। তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ভাতা কয়েক মাস বন্ধ ছিল। কিন্তু গত জুন মাসে ৩০০ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে মুচলেকা নিয়ে অভিযুক্ত ওই ৪২ জনকে উপজেলা প্রশাসন আবারও ভাতা প্রদান করেছেন। এ নিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধার তালিকা যাচাই-বাছাই নিয়েও অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। সূত্র জানায়, দৌলতপুর উপজেলায় মোট ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ হাজার ১৪২ জন। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ এর মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তারা দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলন করছেন।
মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির অন্যতম সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা কাওসার বিশ্বাস বলেন, এ উপজেলায় শতাধিক ব্যক্তি অন্যের সার্টিফিকেট স্ক্যানিং করে জাল সার্টিফিকেট বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন। গত বছরের শুরুর দিকে এ বিষয়ে তিনিসহ আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। এর প্রেক্ষিতে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি যাচাই বাছাই করে ভাতা বন্ধের নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর নির্দেশে গত বছরের অক্টোবরে ৪২ জনের ভাতা বন্ধ করে দেয় উপজেলা প্রশাসন।
এদিকে কয়েক মাস ভাতা বন্ধ থাকলেও গত জুন মাসে ৩০০ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে মুচলেকা নিয়ে অভিযুক্ত ৪২ জনকে উপজেলা প্রশাসন আবারও ভাতা প্রদান করেছেন।
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌফিকুর রহমান জানান, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জুন মাসে তাদের (অভিযুক্ত ৪২ জনের) ভাতা দেওয়া হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত হলে টাকা ফেরৎ দিতে বাধ্য থাকবেন এই মর্মে তাদের কাছ থেকে ৩০০ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের লিখিত অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা যায়, দৌলতপুর উপজেলায় অন্তত ৪২ ব্যক্তি ভুয়া কাগজ পত্র তৈরি করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছেন। তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অথবা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজসে এ কাজ করেছেন।
অভিযোগ উঠেছে এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্ত ভাতার একটি অংশ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কতিপয় নেতা ও সংশ্লিষ্ট দফতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার পকেটে ঢুকছে। এ কাজের সমন্বয় করেন উপজেলার ফিলিপনগর এলাকার একজন মুক্তিযোদ্ধা।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন, প্রাগপুর গ্রামের শাহাব উদ্দিন, ইছাহক আলী, আব্দুল মান্নান, ভুরকাপাড়া গ্রামের আব্দুল বাতেন, মাদাপুর গ্রামের আবুল কাশেম, মহিষকুন্ডির রেজাউল হক, ফিলিপনগরের বক্তার আলী, আনোয়ারুল ইসলাম, নাজিম উদ্দিন, আওলাদ হোসেন, জালাল উদ্দিন, আব্দুল গফুর সর্দার, বিলগাথুয়া গ্রামের আব্দুল মালেক, সিরাজনগরের শাহিদল্লাহ সর্দার, আলাউদ্দিন, কাজিম উদ্দিন, ঠোটারপাড়ার মকবুল হোসেন, মকবুল হোসেন (২), সোনাতলা গ্রামের শাহাজান আলী, শুকুর আলী, মতিউর রহমান খারিজাথাকের আবুল হোসেন, ভাগজোত গ্রামের মহিউদ্দিন, সোনাইকুন্ডির গোলাম মোস্তফা, রিফায়েতপুর জোয়ার্দারপাড়ার আবুল হাসেন, দৌলতপুরের হায়দার আলী, কিশোরীনগরের আব্দুল মান্নান, কামালপুরের মোজাফ্ফর, নজিবপুরের তাহাজ উদ্দিন, মথুরাপুরের শামসুজ্জোহা, শেরপুরের কেরামত আলী, চাইডোবার আব্দুল জলিল, ইসলামপুরের মোতালেব হোসেন ও বেলায়েত হোসেন, হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের জাহানারা এবং মরিাচা ইউনিয়নের ৩ জন ও ঠোটারপাড়ার একজন।
দৌলতপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার দবির উদ্দিন বলেন, কেউ যদি ভুয়া হয়ে থাকে সেটা যাচাই বাছাইয়ের দায়িত্ব সরকারের। তবে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার ও দৌলতপুর উপজেলার সাবেক কমান্ডার আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে সম্প্রতি যাচাই-বাচাই শেষ হওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের নামই ‘ক’ তালিকায় না রেখে ‘খ’ ও ‘গ’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌফিকুর রহমান বলেন, অভিযোগ থাকতেই পারে। তবে যাচাই-বাছাই চলাকালে কেউই এ ব্যাপারে লিখিত কোনো অভিযোগ করেনি বলে দাবি করেন তিনি।
আল-মামুন সাগর/এমএমজেড/এফএ/জেআইএম