ইটিপি ব্যবস্থা না থাকায় শীতলক্ষ্যা-বুড়িগঙ্গার পানি দুষিত হচ্ছে


প্রকাশিত: ০৯:০৭ এএম, ২৪ মে ২০১৫

নারায়ণগঞ্জের শিল্পকারখানায় তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) না থাকায় শিল্পকারখানার বর্জ্যে পরিবেশ দূষিতসহ শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গার পানি দুষিত হয়ে পড়ছে। এতে করে দুই নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো মাথা ব্যথা না থাকায় ও শিল্প মালিকরা ইটিপি স্থাপন না করার ফলে দুটি নদীর পানি পর্যায়ক্রমে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
 
জানা গেছে, একসময় নারায়ণগঞ্জের প্রাণ ছিল শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদী। ৩০-৪০ বছর আগে এই দুটি নদীর পানি নদীর পাড়ের মানুষ রান্নার কাজে ব্যবহার করতেন। বিদেশ থেকে আসা পণ্যবাহী জাহাজগুলো যাওয়ার সময়ে এ নদীর পানি নিয়ে যেত। এখন সেই ঐতিহ্যবাহী শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গার পাড় দিয়ে হাঁটতে হলে নাকে রুমাল ছাড়া আর কোনো গতি থাকে না। কুচকুচে কালো পানির পঁচা দুর্গন্ধের কারণে নাকে রুমাল চেপে নদী পারাপার হতে হয়। শীতলক্ষ্যার দুই তীরে জনসাধারণকে এখন গোসল করতে দেখা যায় না।



জেলার ৫টি উপজেলার শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানে নেই ইটিপি। দেড়শত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন করা হলেও সেগুলো ঠিকমতো চলছে না। গত একবছরে পরিবেশ অধিদফতর প্রায় ৪ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করলেও থামছে না দূষণ। প্রায় সময় শিল্পকারখানায় ইটিপি মনিটরিং করতে গিয়ে শিল্পকারখানার লোকদের বাধার মুখেও পড়তে হচ্ছে পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের। বিভিন্ন শিল্প বর্জ্যের কারণে দেশের দ্বিতীয় দুষিত নদী হিসেবে চিহ্নিত শীতলক্ষ্যা এখন মুমূর্ষু প্রায়।


জানা গেছে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের অক্টোবর মাসের মধ্যে প্রতিটি শিল্প-কারখানায় ইটিপি বা বর্জ্য পরিশোধন প্রকল্প বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে প্রতিষ্ঠান মালিকদের মধ্যে তেমন কোনো সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে ২০১০ সালের জুন মাসের মধ্যে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়া হয়। যেসকল শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে তরল বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হয়ে থাকে সেগুলো হচ্ছে ডাইং ফ্যাক্টরি, পাল্প অ্যান্ড পেপার মিল, কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, সুগার মিল, লেদার প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, অয়েল রিফাইনিং, টারবাইন পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র।


পরিবেশ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে ৩৪৭টি তরল বর্জ্য নির্গমণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে কিছু সরাসরি ও কিছু ড্রেনের মাধ্যমে বর্জ্য নির্গমণ করে। যা শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গায় এসেই পড়ছে। এর মধ্যে ১৫২টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নির্মাণ করা হয়েছে। ৪৮টি প্রতিষ্ঠানে কিছু নির্মানাধীন রয়েছে। ইটিপি নেই এমন শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০৭টি। এর মধ্যে ফতুল্লায় অন্তত অর্ধশত ও রূপগঞ্জে ২৫টির বেশি।

পানিতে জীববৈচিত্রের জন্য ন্যূনতম ৪.৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন থাকার কথা থাকলেও শীতলক্ষ্যাতে রয়েছে মাত্র ০.৫ মিলিগ্রাম। বর্ষাকালে কিছুটা বেড়ে ২ মিলিগ্রাম হয়ে থাকে। যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এখনো ইটিপি স্থাপন করা হয়নি তার মধ্যে অধিকাংশই ছোট আকারের ডাইং ফ্যাক্টরি বলে জানা গেছে।

এর মধ্যে বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ফতুল্লার নয়ামাটি এলাকায় অবস্থিত রূপসী গ্রুপ। যার মালিক বিকেএমইএর একজন সাবেক পরিচালক। রূপসী গ্রুপকে পরিবেশ অধিদফতর জরিমানা করার পর প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ রিট দায়ের করে জরিমানার অর্থ আর প্রদান করেনি। এছাড়া তারা পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের হুমকিও দিয়েছে। পঞ্চবটির ইমপেরিয়াল ডাইংকে ২০০৯ সালে জরিমানা করলেও তারা মামলা দায়েরের মাধ্যমে ইটিপি স্থাপন করেনি। রূপগঞ্জের যাত্রামুড়ার সাহেবা টেক্সটাইলকে দু’দফা জরিমানা করার পরে তারা ইটিপি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। জরিমানা দেয়ার পর ইটিপি নির্মাণ শুরু করেছে ফতুল্লার শিবু মার্কেটের ওসমান নিটেক্স।

পরিবেশ অধিদফতর সূত্র জানায়, গত এক বছরে পরিবেশ দূষণের দায়ে নারায়ণগঞ্জের ১০৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে পরিবেশ অধিদফতর।



পরিবেশ অধিদফতর নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপ-পরিচালক মুজাহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, ইটিপি না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু আদালত থেকে ৬ মাস বা ১ বছর সময় নিয়েছে। কিছু উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেছে। কিছু পরিবেশ অধিদফতরে প্রশাসনিক রিট করেছে। যেসকল প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নির্মাণাধীন রয়েছে সেগুলোকে মনিটরিং করা হচ্ছে।

মুজাহিদুল আরো জানান, নারায়ণগঞ্জ শিল্প বাণিজ্যের নগরী হলেও প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অত্যন্ত কম। মাত্র ৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। তার উপর সন্ধ্যার পরে অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করা যায় না। এর আগে পরিবেশ অধিদফতরের এক কর্মকর্তাকে বেঁধে রাখার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে শীতলক্ষ্যা বাঁচাও এ আন্দোলন নিয়ে নারায়ণগঞ্জের হাতেগোনা দুই-একটি সংগঠন এগিয়ে আসলেও তাদের কার্যক্রম খুবই সীমিত। এসব সংগঠন প্রায়শই নৌ র্যালি, মানববন্ধন, গণসচেতনতামূলক লিফলেট-পোস্টার-মাইকিং, গণস্বাক্ষর কর্মসূচিসহ নানা কর্মকাণ্ড করলেও কার্যত কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বক্তব্য, মানুষের শিরা উপশিরা দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হয়। রক্ত প্রবাহিত না হলে মানুষ যেমন বাঁচবে না তেমনি শীতলক্ষ্যা নদী না থাকলে কিংবা অকার্যকর হয়ে পড়লে নারায়ণগঞ্জও বাঁচবে না। শীতলক্ষ্যাকে বাঁচাতে হলে বিভিন্ন ডাইং ও সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো থেকে যে শিল্পবর্জ্য নিক্ষেপ করা হচ্ছে তা বন্ধ করতে হবে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ড্রেজিং করতে হবে। সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে নদী দখল হয়ে থাকে সে বিষয়টি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বাপা’`র (বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন) সদস্য আব্দুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, শীতলক্ষ্যায় যে সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নির্গত হচ্ছে তা বিকেএমইএ ও বিজেএমইএ’র আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) এসকল প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য কোথায় নির্গত হবে সেটা ওই প্ল্যানে ছিল। তবে ড্যাপের পরিকল্পনা অনুযায়ী শুধুমাত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বাস্তবায়ন হলেও বাকি কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন হয়নি। ড্যাপ বাস্তবায়ন হলে শীতলক্ষ্যা দূষণের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তারপরও পরিবেশ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিবেশ নষ্টকারী শিল্পকারখানার মালিকদের সতর্কসহ ব্যবস্থা নিলে শিথিল হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।   
 
মো.শাহাদাৎ হোসেন/এমজেড/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।