রূপগঞ্জের শতবর্ষী জমিদারবাড়ি


প্রকাশিত: ০৮:৫৭ এএম, ২৫ মে ২০১৫

প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মৃতি কালের গহ্বরে ঢাকা পড়লেও এর নিদর্শন চিরকাল অম্লান। রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ার জমিদার বাড়িটি তেমনই একটি স্মৃতিচিহ্ন বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। ১২৫ বছরের পুরনো এ বাড়িটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে রূপগঞ্জের ইতিহাস, কৃষ্টি, সভ্যতা ও আজকের এই কোলাহলপূর্ণ জনবসতি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে মহাকালের নীরব সাক্ষী হয়ে আজো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ার এ জমিদার বাড়িটি। ছায়া নিবিড় পরিবেশে গড়ে ওঠা মনোমুগ্ধকর এ জমিদার বাড়ি যেকোনো পর্যটকের মন কাড়বে।

রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার মুড়াপাড়া এলাকায় ৫২ বিঘা জমির ওপর এই প্রকাণ্ড জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। জমিদার বাবু রাম রতন ব্যানার্জী তৎকালিন মুড়াপাড়া জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনিই মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন করেন। রাম রতন ব্যানার্জীর ছেলে পিতাম্বর ব্যানার্জী এবং তার ছেলে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী শাহজাদপুরের জমিদারি ক্রয় করে জমিদারি বর্ধন করেন।

কথিত আছে জমিদারি ক্রয় সূত্রে প্রতাপ ব্যানার্জীর সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। ১৮৮৯ সালে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জীর পৈতৃক এজমালি পুরনো বাড়ি ত্যাগ করে আলোচ্য এ প্রাসাদের পেছনের অংশ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জীর ছেলে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী ১৮৯৯ সালে প্রাসাদের সম্মুখ অংশের একতলা ভবন নির্মাণ ও সেখানে ২টি পুকুর খনন করার পর হৃদরোগে মারা যান। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের প্রথম গ্রাজুয়েট।

বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জীর দুই ছেলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী ও আশুতোষ চন্দ্র ব্যানার্জী ১৯০৯ সালে প্রাসাদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। এ অঞ্চলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জীর নাম সমধিক প্রসিদ্ধ। কারণ তিনি দু`বার দিল্লীর কাউন্সিল অব স্টেটের পূর্ববঙ্গ হতে সদস্য নির্বাচিত হন। জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী প্রজা সাধারণের কল্যাণ সাধনের জন্য স্থাপন করেছেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পুকুর। এই জনহিতকর ইতিহাসের উল্টোপিঠেই রয়েছে অত্যাচার ও নির্যাতনের বহু ঘটনা। রয়েছে অসংখ্য স্মৃতি।

বিশাল এ জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে মোট ৯৫টি কক্ষ। নাচ ঘর, আসত্মাবল, উপাসনালয়, কাচারিঘরসহ সবই ছিল এখানে। বিশালাকৃতির প্রধান ফটক পেরিয়ে ঢুকতে হয় ভেতরে। অন্দর মহলে রয়েছে আরও ২টি ফটক। সর্বশেষ ফটক পেরিয়ে মেয়েদের স্নানের জন্য ছিল শান বাধানো পুকুর। পুকুরের চারধার উঁচু দেয়ালে ঘেরা। বাইরের লোকদের জন্য এখানে প্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সচরাচর কোনো পুরুষ যেত না সেখানে। তখন এটি ছিল নীরব এক অনত্মপুরি। কিন্তু বর্তমান দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিকেল হতেই অন্দরমহলের পুকুরের চারধার যুবক-যুবতীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

বাড়ির সামনে রয়েছে আরো একটি বিশাল পুকুর। পুকুরটির চারদিক নকশি কাটা ঢালাই লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। আর চারদিকে চারটি শান বাধানো ঘাট। দিঘি বলেও কেউ মনে করতে পারেন। পুকুর জুড়ে পানি টলমল করছে। এত স্বচ্ছ পানি এতদঞ্চলে আর নেই। এ পুকুরের পানির বৈশিষ্ট্যটাই অন্য রকমের। পানিতে জমিদার বাড়ির প্রতিচ্ছবি ঢেউয়ের তালে দুলছে। মূলত এ পুকুরটি তৈরি করা হয়েছে বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যই। পুকুরের পরিমাপটাও অনেকটা প্রতিচ্ছবির হিসেব মিলিয়েই তৈরি করা। পুকুর সংলগ্ন মন্দির। মন্দিরের বড় দুটি চূড়া রয়েছে। তা প্রায় ৩০ ফুট উঁচু। এর প্রবেশদ্বারগুলো খিলান দিয়ে নির্মিত। মন্দিরের মূল কক্ষ বেশ ছোট এবং অন্ধকার।

মন্দিরের বা পাশ ঘেঁষে ছায়াঘেরা শান্ত শ্যামল প্রকাণ্ড আম্রকানন রয়েছে। গাছগুলো বেশ পুরনো। একই মাপের ঝাঁকরানো গাছ। ডালপালা ছড়ানো, অনেকটা ছাতার মতো। অসংখ্য গাছ। প্রায় প্রতিটি আমগাছের গোড়া পাকা করা। এখানে আছে সারি সারি পান ও সুপারি বাগান। এ ছাড়া জমিদার বাড়ির প্রবেশ মুখেই সারি সারি ঝাউগাছ। প্রতি বছর এখানে আসে পিকনিক পার্টি। এছাড়া সারা বছর ধরেই এখানে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। বিদেশি পর্যটকরাও আসেন এ বাড়িটিতে। এ বাড়িকে ঘিরে এ যাবৎ বহু চলচ্চিত্র, মিউজিক ভিডিও এবং টিভি নাটকের দৃশ্যধারণের কাজ হয়েছে।

মূলত এ অঞ্চলের বহু স্মৃতি যুগ যুগ ধরে বহন করছে এ জমিদার বাড়িটি। নয়ন জুড়ানো রূপগঞ্জের এ জমিদার বাড়ির ভেতরের অপরূপ কারুকাজ, নিপুণ হাতের শিল্পকর্ম দেখে আজও পর্যটকরা বিস্মিত হন।

ঢাকা থেকে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ার জমিদার বাড়িতে আসতে সময় লাগে ৪০-৫০ মিনিট। বাসে কিংবা বেবিট্যাক্সি করে আসা যায় এখানে। রাজধানী ঢাকার সায়েদাবাদ অথবা গুলিস্তান থেকে মুড়াপাড়ার বাসে চেপে এলে ভাড়া লাগবে ১৫ টাকা। সেক্ষেত্রে সিএনজিতে লাগে ১২০ টাকার মতো। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রূপগঞ্জের রূপসী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এলে বেবিট্যাক্সি অথবা রিকশাযোগে পিচঢালা রাস্তা দিয়ে সহজেই আসা যায় এ জমিদার বাড়িতে।

এমজেড/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :