নেত্রকোনায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ০৬:১৫ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০১৭

কয়েকদিনের টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার ৮টি উপজেলার অন্তত দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানি প্রবেশ করায় জেলার ২৩৯টি প্রাথমিক ও ১৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এছাড়াও দুর্গাপুর-কলমাকান্দা উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

টানা তিনদিন বন্যার পানিতে রোপা আমন তলিয়ে যাওয়ায় চারা পচে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন কৃষকরা। ভেসে গেছে কয়েক হাজার পুকুরের মাছ। চরম খাদ্য সংকটে পড়েছে গবাদি পশু। আর ঘরের ভেতর বন্যার পানি প্রবেশ করায় পানিবন্দি মানুষও রয়েছে চরম আতঙ্কে।

গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে প্রথমদিকে নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও সোমবার দুপুর থেকে জেলার কংস, ধনু, উব্দাখালিসহ অন্যান্য নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।গতকাল রোববার ছয় উপজেলার ৫শ গ্রাম প্লাবিত হয়।

সোমবার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আরও ২শ গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে এসব গ্রামের মানুষের ঘরের ভেতরে পানি প্রবেশ করেছে। রান্নার চুলায় পানি থাকায় বিকল্প হিসেবে চেয়ারের ওপর চুলা পেতে কোনো রকম রান্না করে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। কোনো কোনো পরিবার গত দুই দিন থেকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন।

জেলা প্রশাসনের দেয়া প্রাথমিক হিসেব মতে, নেত্রকোনার দুর্গাপুরের সাত ইউনিয়নের সাতটিতে ক্ষতি হয়েছে ৭ হাজার ২০টি পরিবারের ৩৪ হাজার ৫০০ মানুষ। এই উপজেলার বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ৫৫০টি বসত বাড়ি ও ৪৬টি স্কুল। ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৫০ হেক্টর আবাদী জমির রোপা আমন। প্রাথমিক হিসেবে দুর্গাপুরের ১০০ কি.মি. সড়কের ক্ষতি হয়েছে। ৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৫০ জন লোক আশ্রয় নিয়েছে। ওই উপজেলায় শুকনো খাবারের জন্য ৬০ হাজার টাকা ও ১০ মেট্রিক টন চাল তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

nn

কলমাকান্দার আট ইউনিয়নের আটটিতে ক্ষতি হয়েছে ১৫ হাজার ৯৯০টি পরিবারের ৫২ হাজার মানুষ। এই উপজেলার বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ৫৮৮টি বসত বাড়ি ৫টি স্কুল। ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর আবাদী জমির রোপা আমন। প্রাথমিক হিসেবে কলমাকান্দার ৬৫ কি.মি. সড়কের ক্ষতি হয়েছে। ২টি আশ্রয় কেন্দ্রে ২৫০ জন লোক আশ্রয় নিয়েছে। ওই উপজেলায় শুকনো খাবারের জন্য ৫০ হাজার টাকা ও ৮ মেট্রিক টন চাল তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

পূর্বধলার ১১টি ইউনিয়নের চারটিতে ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৫০০টি পরিবারের ৬ হাজার ১০০ মানুষ। এই উপজেলার বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ৪৫০টি বসত বাড়ি ৭টি স্কুল। ক্ষতি হয়েছে ৫০ হেক্টর আবাদী জমির রোপা আমন। প্রাথমিক হিসেবে পূর্বধলার ৩ কি.মি সড়ক ও ১ হাজার ৭৫০ মিটার বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। ১টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৫০ জন লোক আশ্রয় নিয়েছে। ওই উপজেলায় শুকনো খাবারের জন্য ৩০ হাজার টাকা ও ৭ মেট্রিক টন চাল তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

বারহাট্টার ৭টি ইউনিয়নের ৩টিতে ক্ষতি হয়েছে ৮০০টি পরিবারের ৩ হাজার ৮০০ মানুষ। এই উপজেলার বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ২০০টি বসত বাড়ি ৬টি স্কুল। ক্ষতি হয়েছে ৭৬ হেক্টর আবাদী জমির রোপা আমন। প্রাথমিক হিসেবে বারহাট্টার ১৫ কি.মি. সড়ক ও ৩০০ মিটার বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। ওই উপজেলায় শুকনো খাবারের জন্য ১০ হাজার টাকা তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এছাড়া নেত্রকোনা সদরের ১২টি ইউনিয়নের চারটিতে ক্ষতি হয়েছে ৫ হাজার ৫০০টি পরিবারের ২২ হাজার ৫০০ জন মানুষ। এই উপজেলার বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ২৫০টি বসত বাড়ি ও ১৯টি স্কুল। ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর আবাদী জমির রোপা আমন। প্রাথমিক হিসেবে নেত্রকোনা সদরের ৬৫ কি.মি. সড়কের ক্ষতি হয়েছে। ওই উপজেলায় শুকনো খাবারের জন্য ১০ হাজার টাকা তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

নেত্রকোনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম রিয়াজ উদ্দিন জাগো নিউজকে জানান, জেলার ১ হাজার ৪৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩৯টি প্রাথমিক ও ১৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করায় সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।

nn

জেলা সিভিল সার্জন তাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, বন্যা দুর্গত মানুষের সেবা দেয়ার জন্য ৯৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক বন্যা দুর্গত এলাকার খোঁজ খবর রাখছেন।

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু তাহের জাগো নিউজকে জানান, সোমবার দুপুর পর্যন্ত জেলার সব কটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে বিরিশিরির সুমেশ্বরী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৫ সে.মি. কংসনদের জারিয়া পয়েন্টে ১৮২ সে.মি. উব্দাখালির কলমাকান্দা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১০০ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ড. মোশফিকুর রহমান জাগো নিউজকে জানান, জেলার ৮৬টি ইউনিয়নের ৬ হাজার ২৬ হেক্টর জমির রোপা আমন, ৩ হাজার ৭৯৩টি পরিবারের ১ লাখ ১৮ হাজার ৯০০ মানুষের ২ হাজার ৩৮টি বাড়ি, ৮৩টি স্কুল, ১৪৮ কি.মি. সড়ক, ২ হাজার ৫০ কি.মি. বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েচে। ৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৫৫০ জন আশ্রয় নিয়েছে। শুকনো খাবারের জন্য মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ও ২৫ মেট্রিক টন চাল তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

কামাল হোসাইন/আরএআর/বিএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।