মানিকগঞ্জের শতবর্ষী খালটি হুমকির মুখে


প্রকাশিত: ০৯:১৭ এএম, ০৫ জুন ২০১৫

মানিকগঞ্জ শহরের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খালটি বর্তমানে শহরে বসবাসকারী নাগরিকদের জন্য পরিবেশগতভাবে হুমকি স্বরূপ হয়ে পড়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও সৌন্দর্য্য বর্ধনের বিপরীতে ঐতিহ্যবাহী খালটি এখন ময়লা আবর্জনার ভাগাড় আর মশার অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে।

ময়লার আবর্জনা দূষণে গন্ধের মাত্রা এতটাই বেশী যে সাধারণ জনজীবন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। খালের পাশ দিয়ে নাকে রুমাল ছাড়া চলাও মুশকিল। এদিকে খাল অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে অর্ধ যুগেও দখল মুক্ত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে খালটি এখন শহরের বসবাসকারী নাগরিকদের জন্য পরিবেশ দূষণের অন্যতম মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পৌরসভার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটিকে রক্ষণাবেক্ষণ ও সৌন্দর্য্য বর্ধনে পৌর কর্তৃপক্ষ এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২০০৮ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। ৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭টি প্যাকেজের মাধ্যমে খালটির খনন ও সৌন্দর্য্য বর্ধনের কাজ করানো হয়। শহরের বান্দুটিয়া থেকে শুরু হয়ে শুরুণ্ডি পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার ব্যাপী খালের দু`পার সিসি ব্লক ফেলে বাধানো হয়। খালের পাড় দিয়ে মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তার ব্যবস্থাসহ শহরের বাজার ব্রিজের কাছ থেকে সরকারি মহিলা কলেজ পর্যন্ত খালের পাড়ে বৈকালিক সময় কাটানোর জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে তৈরি করা হয় সিমেন্টের বেঞ্চ।  কিন্তু খাল তীরবর্তী অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির শৌচাগারের মলমূত্র পাইপের মাধ্যমে খালে ফেলায় আশপাশে দূর্গন্ধের কারণে সকল আয়োজন ব্যর্থ হয়ে পড়েছে।

খালের ভেতরে কচুরিপানা, মলমূত্র আর ময়লায় ভরে গেছে। খালের অভ্যন্তরে ফেলা ময়লা আবর্জনা থেকে সৃষ্ট বিকট দুর্গন্ধে  ওই সব বেঞ্চে বসার তো দূরের কথা খালের পাড় দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল এখন কষ্টকর হয়ে পড়েছে। খালের পাড়ে অবস্থিত সরকারি মহিলা কলেজ ও বেশ কয়েকটি শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শত শত কোমলমতি শিশুসহ কলেজের শিক্ষার্থীরা নিত্যদিন অসুস্থকর পরিবেশে পড়ালেখা করছে।
 
শতবর্ষী এই খালের উৎপত্তি কালীগঙ্গা নদী থেকে। শহরের বেউথা কালীগঙ্গা মোহনা থেকে খালের যোগসুত্র শেষ হয়েছে শহরের পৌর এলাকা টপকিয়ে সদর উপজেলার পালড়া হয়ে ফের কালীগঙ্গায়। এক সময় খালটি ছিল বেশ প্রসস্ত। প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি কেবল মানিকগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যের নিদর্শনই নয়,শহরটিকে জলাবদ্ধতার হাত থেকেও রক্ষা করছে। ষাটের দশকেও এই খালে নৌকা বাইচ হয়েছে। ব্যবসায়ীরা দূর দূরান্ত থেকে নৌকায় করে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী আনা নেয়া করতো। কিন্তু কালের আবর্তের স্বাধীনতার পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী দখলদাররা খালটিকে গলা টিপে হত্যার প্রচেষ্টা চালান।

সরেজমিনে দেখা যায়, মানিকগঞ্জ শহরের খালপাড় সেতু এলাকা থেকে গঙ্গাধরপট্টি বাজার সেতু এলাকা পর্যন্ত খালের দক্ষিণপাড় দখল করে ওঠেছে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন। চলছে আরও কয়েকটির নির্মাণ কাজ। বান্দুটিয়া, দক্ষিণ সেওতা, গঙ্গাধরপট্টি ও পূর্ব দাশরা এলাকার কিছু কিছু অংশে সিসি ব্লক দেবে গেছে।
 
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা শাখার আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে গত ৬/৭ বছর ধরে বর্ষাকালেও কালীগঙ্গা নদীর পানির উচ্চতা কম থাকে। এছাড়া পলিমাটিতে বেউথা এলাকায় খালের সম্মুখ অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে খালটিতে পানি ঢুকতে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

 শহরের বাসিন্দা ও খান বাহাদুর আওলাদ হোসেন ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু জাগো নিউজকে বলেন, খাল দখল করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির শৌচাগারের মলমূত্র পাইপের মাধ্যমে খালে ফেলা হচ্ছে। এতে আশপাশে দূগর্ন্ধ ছড়াচ্ছে এবং পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।  
 
স্থানীয় পরিবেশবিদ ও উন্নয়নকর্মী অ্যাডভোকেট দীপক কুমার ঘোষ জাগো নিউজকে জানান, খালটি রক্ষায় এটি খনন ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। অন্যথায় আগামী দু-এক বছরের মধ্যে খালের বাকিটুকুও দখল হয়ে যেতে পারে। এর দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণ এবং ফুটপাত নির্মাণ করা হলে পৌরবাসীর বিনোদনের একটি ভালো জায়গা হতে পারে।
 
পৌর মেয়র মো. রমজান আলী জাগো নিউজকে বলেন, খালটি রক্ষায় দুই পাড় বাঁধা ও ফুটপাত নির্মাণ করা হয়েছে। তবে খালের পাড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিকেরা খাল দখল করে ফেলছেন। ইতোমধ্যে খাল দখলকারীদের বেশ কয়েকবার নোটিশও দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা তা মানছেন না। দখল উচ্ছেদের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের।

জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস জাগো নিউজকে বলেন, খুব শিগগিরই খাল দখলকারীদের তালিকা তৈরি করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে। খালটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।

এমজেড/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।