নিম্নচাপের প্রভাবে দুর্ভোগে উপকূলের লাখো মানুষ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০২:০৮ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০১৭

ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার মৌসুমী নিম্নচাপের প্রভাবে পুরো কক্সবাজার জুড়ে ঝড়ো হাওয়া বইছে। শুক্রবার ভোর থেকে থেমে বর্ষণ ও দমকা হাওয়া উড়িয়ে নিচ্ছে শহর-গ্রামের ঝুপড়ি ঘর। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগরে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে।

এতে নতুন করে ভাঙনের কবলে পড়েছে পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালীসহ উপকূলের বেড়িবাঁধের বেশ কয়েকটি অংশ। আর পুরনো ভাঙন দিয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে উপকূলের গ্রামের পর গ্রাম। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপকূলের লাখো মানুষ।

jagonews24

সদর উপজেলার পোকখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিক আহমদ ও গোমাতলী উপনিবেশ সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোসলেম উদ্দিন জানান, নিম্নচাপের প্রভাবে সাগরে জোয়ারের পানি বাড়ায় শুক্রবার রাতে ও শনিবার দিনের জোয়ারে গোমাতলীর ৬ নম্বর ও ৮ নম্বর স্লুইচ গেইট এলাকার ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে বৃহত্তর গোমাতলীর ৮ গ্রাম পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। ডুবে গেছে রাস্তাঘাট। গত বছরে রোয়ানুর কবলে ৬ নম্বর আর মোরার কবলে ৮ নম্বর স্লুইচ গেইট এলাকায় বেড়িবাঁধটি ভেঙে যায়। ভাঙন দুটি গোমাতলীর অর্ধলাখ মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অপরদিকে পেকুয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে সাগরের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে রাজাখালী ইউনিয়নের বকশিয়া ঘোনা ও নতুন ঘোনা গ্রাম। এতে ওই এলাকার চিংড়ি ঘের ও কাচা বসতঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

শনিবার দুপুরের জোয়ারে বকশিয়া ঘোনা এলাকার উত্তর পাশে জহিরের দোকানের পেছনে ও পশ্চিম পাশে নেজামের বাড়ির সামনে বেড়িবাঁধে দুটি আলাদা অংশ ভেঙে জোয়ারের পানি এলাকায় প্রবেশ করে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপে অত্যাধিক জোয়ারের কারণে বেড়িবাঁধে এ ভাঙন দেখা দেয়। কিছু কিছু এলাকায় বেড়িবাঁধ উপচে সাগরের পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে।

রাজাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছৈয়দ নূর বলেন, প্লাবিত এলাকার লোকজনকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হযেছে। বেড়িবাঁধের এসব অংশ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণের কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারের অবহেলার কারণে বকশিয়া ঘোনা এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পেকুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজু বলেন, ভাঙা বেড়িবাঁধ মেরামতে ঊর্ধ্বতন মহলে বার বার যোগাযোগ করা হচ্ছে। কিছু বরাদ্দ এসেছে আর কিছু এখনো প্রক্রিয়াধীন। তবে বার বার নিম্নচাপ ও বৈরি আবহাওয়ার কারণে কোনোভাবেই কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।

শনিবার দিনের জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ও মাতারবাড়ির নয়টি গ্রাম। ধলঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল হাসান জানান, বৈরি আবহাওয়ার কারণে সাগরের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বেড়িবাঁধের ভাঙা অংশ পানি ঢুকে ইউনিয়নের উত্তর সুতুরিয়া, শরইতলা, পন্ডিতেরডেইল ও বেগুনবনিয়া গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। একই সাথে প্লাবিত হয়েছে ভারতঘোনাও।

মাতারবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার মাহমুদুল্লাহ জানান, উত্তর রাজঘাট ও দক্ষিণ রাজঘাটের বেড়িবাঁড়ের ৭০ নং ফোল্ডার ভাঙা ছিল। সাগরের পানি বেড়ে এই পয়েন্ট দিয়ে পানি ঢুকে উত্তর রাজঘাট, দক্ষিণ রাজঘাট, ফুলজানমোরা, বানিয়াকাটা প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে ইউনিয়নের পশ্চিম দিকে নড়বড়ে বেড়িবাঁধ দিয়েও পানি ঢুকেছে। এতে সাইট পাড়াও প্লাবিত হয়েছে। স্লুইচ গেট বন্ধ থাকায় আটকে রয়েছে পানি। এতে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

 

jagonews24

 

ধলঘাটা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল হাসান, চকরিয়ার মানিক চেয়ারম্যান ও মাতাবাড়ির মানিক ঠিকাদার ধলঘাটার বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ নেন। কিন্তু তারা ঠিক মতো কাজ করেনি। ফলে একটু পানি বাড়লেই ভেঙে যাচ্ছে বেড়িবাঁধ। এ ব্যাপারে বেশ কয়েকবার লিখিত অভিযোগ করেও কাজ হয়নি।

কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল বশর চৌধুরী জানান, জোয়ারের পানি বাড়ায় বেড়িবাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে নিচু এলাকায় পানি ঢুকেছে। অনেক স্থানে নতুন করে তলিয়ে যাচ্ছে বাধের অংশ। এ অবস্থা বিদ্যমান থাকলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ উজ্জল কান্তি পাল জানিয়েছেন, মৌসুমী নিম্নচাপটি ক্রমে পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উপকূলের পার্শ্ববর্তী এলাকায় থেকে থেমে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বইছে। নিম্নচাপের প্রভাবে সাগরে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বেড়েছে। থেমে থেমে হওয়ায় বৃষ্টিপাত কাউন্ট করার পর্যায়ে আসেনি। তবে জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, কয়েক মাস আগে ঘূর্ণিঝড় মোরা মোকাবেলা করেছি আমরা। এখন আবারও নিম্নচাপের প্রভাবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। জোয়ারের পানি বাড়ায় নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পেয়েছি। যেকোনো দুর্যোগ মুহূর্ত এড়ানোর আগাম প্রস্তুতি নিতে ইউএনওদের নির্দেশনা দেয়া আছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও নিম্নচাপে উপকূলের বাঁধগুলো বার বার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়া অনেক বাঁধ মেরামতে টেন্ডার হয়ে থাকলেও বৈরি আবহাওয়ার কারণে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। আবহাওয়া অনুকূলে এলেই নদী ও সাগরের কিনারের বেড়িবাঁধ মেরামতে হাত দেয়া হবে।

সায়ীদ আলমগীর/আরএআর/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।