ধুঁকছে খোদ হাসপাতালই
জনবল সংকটের কারণে গাইবান্ধার ৬ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো চলছে কোনো রকমে। ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো থেকে মেডিকেল অফিসার ও স্যাকমো নিয়ে এসে চালানো হচ্ছে চিকিৎসার কাজ। এছাড়া জনবল সংকটের কারণে মেশিন থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে সেগুলোও পড়ে থেকে অকেজো হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন জেলা প্রতিনিধি রওশন আলম পাপুল।
কমছে ফুলছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগী সংখ্যা
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণে সাত কিলোমিটার দূরে ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদ। সেখান থেকে আরও প্রায় তিন কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে অজোপাড়াগায়ে অবস্থিত ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ফলে এই হাসপাতালটিতে থাকতে চান না কোনো চিকিৎসক। দুপুরের পর কোনো রোগী এলে ডাক্তারকে মোবাইলে কল দেয়ার পরই আবাসিক থেকে আসেন জরুরি বিভাগে।
এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিসিন, সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের তিনজন জুনিয়র কনসালটেন্ট নেই। নেই ডেন্টাল সার্জনও। নেই এক্সে-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন। এছাড়া আরও প্রায় ৫০ পদ শূন্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে শহরমুখী হচ্ছে। এতে দরিদ্র মানুষদের ভোগান্তি বাড়ছে, বেড়ে যাচ্ছে চিকিৎসা খরচও।
সাদুল্লাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সুইপারদের দাপট
হাসপাতালের টয়লেট ও অন্যান্য স্থানগুলো ঠিকমতো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন না করার কারণে চাপ প্রয়োগ করায় চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন এক সুইপার। শাস্তিস্বরূপ আরেকজনের বেতন বন্ধ করেও তাকে ফেরানো যায়নি কাজে। তাই হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তার স্বজনদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বহির্বিভাগের সব চিকিৎসকদের কক্ষে তালা ঝুলছে। ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের কক্ষে চিকিৎসক নেই। জরুরি বিভাগের কক্ষেও নেই চিকিৎসক। সেখান থেকে দোতলায় মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডে ঢুকতেই ভেসে এলো দুর্গন্ধ। টয়লেটগুলো পরিস্কার না করায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এরপর সেখান থেকে তৃতীয় তলায় পুরুষ ওয়ার্ডেও একই অবস্থা। রোগীদের অনেক কষ্টে এখানে থাকতে হয় বলে অভিযোগ করলেন স্বজনরা।
এছাড়া এখান নেই কোনো নার্স। দ্বিতীয় তলা থেকে এসে তৃতীয় তলায় চিকিৎসা দিতে হয়। এই হাসপাতালে দীর্ঘদিন থেকে নষ্ট হয়ে রয়েছে আল্ট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রে মেশিন। এছাড়া এখানকার পানিতে প্রচুর আয়রন রয়েছে। অল্প কিছুক্ষণ পরেই সেই পানি আর খাওয়া যায় না।
পলাশবাড়ীতে ব্রাদার লিখছে রোগীর ব্যবস্থাপত্র
পলাশবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে ব্রাদার খলিলুর রহমান রোগের বর্ণনা শুনে ব্যবস্থাপত্র লিখে রোগী ভর্তি করছেন। অথচ রোগীর স্বজনরা জানেন না যে তিনি ডাক্তার নন, একজন ব্রাদার। এভাবেই একের পর এক রোগী ভর্তি করছেন সেই ওয়ার্ড বয়।
এছাড়া দোতলা থেকে কক্ষ পরিস্কারের পানি নিচে চলাচলের রাস্তায় পড়ছে। ব্যবহারের পর ব্যান্ডেজের কাপড়গুলো জরুরি বিভাগের কক্ষেই পড়ে থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। হাসপাতালটিতে সিনিয়র স্টাফ নার্স ৯ জনের মধ্যে আছেন মাত্র পাঁচজন, ফার্মাসিস্ট পদে দুইজনের মধ্যে আছেন একজন। এছাড়া আরও বিভিন্ন পদে সাতটি পদ শূন্য রয়েছে। এখানেও আল্ট্রাসনোগ্রাম ও এক্সরে মেশিন নেই।
পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াজেদ আলী বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় বহির্বিভাগের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে খলিলুর রহমান দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা (সিনিয়র স্টাফ নার্স) হলেও তিনি ব্যবস্থাপত্র লিখে রোগী ভর্তি করতে পারবেন না। সেই সময় হয়তো কিছু সময়ের জন্য চিকিৎসক ছিলেন না, তাই তিনি রোগী ভর্তি করেছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
সুন্দরগঞ্জে চলে না আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্সরে ও ইসিজি মেশিন
ডাক্তারের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন দুইটি। টেকনিশিয়ানের অভাবে এক্সরে ও ইসিজি মেশিন দুইটিও চালানো হয় না। এই হাসপাতালে অপারেশন হয় না। অথচ এখানে অপারেশন থিয়েটার রয়েছে চারটি। বহির্বিভাগের চিকিৎসা দেওয়া হয় ডেন্টাল ও অন্যান্য ডাক্তার দিয়ে।
হাসপাতালে নেই একজন করে আবাসিক মেডিকেল অফিসার, জুনিয়র কনসালটেন্ট (এনেসথেসিয়া ও মেডিসিন), মেডিকেল অফিসার, ডেন্টাল সার্জন, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার। ফার্মাসিস্ট ও নিরাপত্তা প্রহরী পদ দুইটিতে চারজন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে একজনও নেই। এ ছাড়া আরও ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ পদ শুন্য রয়েছে এই হাসপাতালের।
কিছুই নেই সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে
খেলতে গিয়ে চোখ, নাক ও মাথায় গুরুতর আঘাত পায় আকাশ আকন্দ (৮)। এরপর তাকে সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে ডিজিটাল এক্সে-রে করতে বলা হয়। পরে আকাশের বাবা আলম মিয়া গত ১ নভেম্বর গাইবান্ধা জেলা শহরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে এক্স-রে করে নিয়ে যান। এতে তার এক্স-রে ব্যয় হয় ৬০০ টাকা ও যাতায়াত খরচ লাগে ৭০০ টাকা। এছাড়া ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাকে এক হাজার ২শ টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে।

আলম মিয়া বলেন, গরিবদের জন্য নাকি সরকারি হাসপাতাল। সেখানে গেলে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়। কিন্তু এখন দেখছি সরকারি হাসপাতালে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষাই করা হয় না এমনকি ওষুধও পাওয়া যায় না।
রোগীদের অভিযোগ, এখানে স্যালাইনও কিনে খেতে হয়েছে। দুর্গন্ধে টয়লেটে যাওয়া যায় না। বেডে শুয়েও দুর্গন্ধ আসে।
গোবিন্দগঞ্জ ৭ মাস ধরে খোঁজ নেই মেডিকেল অফিসারের
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে একজন অ্যাক্সিডেন্টের রোগী রয়েছে। তার আঘাত পাওয়া স্থানে ড্রেসিং করছে ওয়ার্ডবয়। হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. দেবশ্রী সাহা অসুস্থতার জন্য সাত দিনের ছুটির দরখাস্ত দিয়ে গত সাত মাস আর হাসপাতালে আসছেন না। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসারদের দিয়ে এখানে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মজিদুল ইসলাম বলেন, এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অনেক পুরোনো। সেজন্য ভবনটির অনেক কক্ষেই চুঁইয়ে পানি ঢোকে। এজন্য নতুন ভবন নির্মাণ দরকার। এছাড়া ছুটি ছাড়া ডা. দেবশ্রী সাহা অনুপস্থিত থাকায় তাকে শোকজ করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. মো. আবদুস শাকুর বলেন, জনবল সংকটের কারণে উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো থেকে মেডিকেল অফিসার ও স্যাকমো নিয়ে এসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ে জনবল চেয়ে আবেদন করা হয়েছে ওয়েবসাইটও আপডেট করা আছে। কিন্তু জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। জনবল পাওয়া গেলেই এসব সমস্যার সমাধান হবে।
রওশন আলম পাপুল/এফএ/আরআইপি