উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে শুধু ড্রেসিং করা হয়
গাইবান্ধার সাত উপজেলায় ৩৬টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় সাতটি, ফুলছড়িতে একটি, গোবিন্দগঞ্জে ১০টি, সাদুল্লাপুরে ছয়টি, সুন্দরগঞ্জে সাতটি ও পলাশবাড়ীতে পাঁচটি।
সাঘাটা উপজেলায় কোনো উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র নেই। একটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে স্বাস্থ্য বিভাগের একজন মেডিকেল অফিসার (এমও), একজন (সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার) স্যাকমো, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন এমএলএসএস এবং পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের একজন এফডাব্লিউভি ও একজন আয়া দায়িত্ব পালন করেন।
বিভিন্ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত কয়েকজন মেডিকেল অফিসার ও স্যাকমো জনবল সংকটের কারণে নেয়া হয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য সেবা আরও ভেঙে পরেছে। শুধুমাত্র রোগীদের ওষুধ দেয়া ও ড্রেসিং করা হয়।
গাইবান্ধার ৩৬টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসার পদে কর্মরত আছেন ১১ ও শুন্য ২৫, স্যাকমো পদে কর্মরত ২৭ ও শুন্য ৯, ফার্মাসিস্ট পদে কর্মরত ১৮ জন ও শুন্য ১৮ এবং এমএলএসএস পদে কর্মরত রয়েছেন ২৩ জন ও শুন্য রয়েছেন ১৩ জন।
মেডিকেল অফিসার, স্যাকমোসহ বিভিন্ন পদে জনবল কম থাকায় এসব উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে সঠিক চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
অপরদিকে জনবল সংকটের কারণে যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদের কাজের চাপ বেড়ে গেছে। সরেজমিনে এসব কেন্দ্রের কয়েকটিতে পরিদর্শন করে জানা গেছে, মেডিকেল অফিসার, স্যাকমো ও এফডাব্লিউভি না থাকায় চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে ফার্মাসিস্ট ও এমএলএসএসদের। যে পরিমাণ ওষুধ দেয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
গত ৪ নভেম্বর দুপুর পৌনে ১টায় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের মহিমাগঞ্জ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা ভবনের নিচতলায় মেডিকেল অফিসার ও স্যাকমোর কক্ষে তালা লাগানো।

ফার্মাসিস্ট আবু রায়হান রোগের বর্ণনা শুনে রোগীদের ওষুধ দিচ্ছেন। আবু রায়হান জানান, এখানে মেডিকেল অফিসার রিয়াদ হাসানকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেপুটেশনে নেয়া হয়েছে। এখানে ছয় মাস থেকে মেডিকেল অফিসার নেই। আজ স্যাকমো ছুটিতে রয়েছেন। এখানে এফডাব্লিউভি, এমএলএসএস ও আয়া রয়েছেন। এখানকার আবাসিকে শুধু এফডাব্লিউভি কামরুন নাহার থাকেন। ভবনের জানালার অনেকগুলো কাঁচের গ্লাস ভেঙে গেছে অনেক আগেই।
একইদিন দুপুর দেড়টায় শিবপুর ইউনিয়নের সর্দারহাট এলাকায় পানাউল্লাহ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ফার্মাসিস্ট তোফাজ্জল হোসেন এখানে রোগী দেখেন ও ওষুধ দেন। এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার পদটি শুন্য রয়েছে। আর স্যাকমো ও এমএলএসএসকে ডেপুটেশনে নেয়া হয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামে ৪৬ শতাংশ জমি থাকলেও সর্বশেষ রেকর্ডে হয়ে গেছে ২৭ শতাংশ। আর বর্তমানে এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে সর্দারহাট দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে। অভাব রয়েছে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের।

তোফাজ্জল হোসেন বলেন, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ৯ শতাংশ জায়গার একটি পুকুরে মাটি ভরাটের কাজ চলছে। এরপর সেখানে একটি টিনের ঘর তৈরি করা হবে। সেখানেই চলবে এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসা কার্যক্রম। বর্তমানে এখানে কেটে যাওয়া জখম রোগীদের ড্রেসিং ও সেলাই করা হয়। ওষুধ এবং রোগীদের ড্রেসিং ও সেলাই করার বিষয়ে স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গেলে ঠিকমতো ওষুধ পাওয়া যায়না। শুধু ড্রেসিং করা হয় কিন্তু সেলাই দেয়া হয়না। ওষুধের বিষয়ে তোফাজ্জল হোসেন বলেন, যা ওষুধ পাওয়া যায় তা রোগীর তুলনায় অনেক কম। ওষুধের পরিমাণ আরও বাড়ানো দরকার।
গত ১৫ নভেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টায় ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, এমএলএসএস কাজল বেগম রোগীদের কাছ থেকে রোগের বর্ণনা শুনে ওষুধ দিচ্ছেন। স্যাকমো রুহুল আমিন মিন্টু উপস্থিত নেই। এখানে মেডিকেল অফিসার ও ফার্মাসিস্ট পদ দুইটি শুন্য রয়েছে।
এ ছাড়া এফডাব্লিউভি ও আয়া পদে কেউ কর্মরত নেই এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের টিনশেড ঘরের বাইরে কোনো সাইনবোর্ড নেই। বোঝারও উপায় নেই এটি কোনো উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র। ঘরের জানালাগুলো ভেঙে গেছে। টিউবওয়েল থেকে পানি ওঠে না। টয়লেট নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই।

কাজল বেগম বলেন, কাজ করতে গিয়ে যা শিখেছি শুধু সেসব রোগের ওষুধ দেই। স্যাকমো কেন্দ্রে না থাকলে তখন বাধ্য হয়ে রোগীদের ওষুধ দিতে হয়। কেননা অনেক দূর-দুরান্তর থেকে অনেক রোগী আসেন। তাদেরকে তো আর ফেরত দিতে পারি না। উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তিনবিঘা জমি থাকলেও এখন দশ শতাংশেরও কম জায়গা রয়েছে। বাকিসব দখল হয়ে গেছে।
মহিমাগঞ্জ, পানাউল্লাহ ও কঞ্চিপাড়া উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মতো জেলার প্রায় অধিকাংশ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রেরই একই অবস্থা।
এসব বিষয়ে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস শাকুর জাগো নিউজকে বলেন, জনবল সংকটের জন্য চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। জনবল চেয়ে কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মেডিকেল অফিসার ও স্যাকমো কম থাকায় উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসারদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
রওশন আলম পাপুল/এমএএস/এমএস