রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে বিজিবি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি খাগড়াছড়ি
প্রকাশিত: ০৭:৪০ এএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০৮:৩৯ এএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭
রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন থেকে বিজিবি

আজ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি দিবস। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে পার্বত্য চট্টগ্রামে লুসাই বিদ্রোহ দেখা দিলে এ এলাকা রক্ষায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন ৪৪৮ জন সৈন্য আর ৬ পাউন্ড গোলা, ৪টি কামান ও ২টি অনিয়মিত অশ্বরোহী দল নিয়ে পাহাড়ি জনপদ সীশান্তঘেঁষা রামগড়ে গঠন করে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’।

সময়ের পালাবদলের সাথে সাথে এ বাহিনীতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ১৭৯৫ সালে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ নামে বাহিনীটির গোড়াপত্তন হওয়ার পর কালের বিবর্তনে পরিবর্তন হয় বাহিনীটির নামও। এ বাহিনীর বহরে ভারী অস্ত্রশস্ত্র যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবর্তন এসেছে পোশাকেও। সময়ের তাগিদে বৃদ্ধি পেয়েছে জনবল আর শক্তি সামর্থও।

১৭৯৫ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ বছর ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ নামেই এ বাহিনীর কার্যক্রম চলে। ১৮৬১ সালে নিয়মিত-অনিয়মিত পুলিশ বাহিনীর সমন্বয়ে রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়নকে পুনর্গঠিত করে নামকরণ হয় ‘ফ্রন্টিয়ার গার্ডস’। যার সৈন্য সংখ্যা উন্নীত করা হয় ১ হাজার ৪৫৪ জনে। যার সদর দফতর ছিল চট্টগ্রামে। ওই সময় এ পার্বত্য এলাকায় লুসাই বিদ্রোহ চরম আকার ধারণ করলে ১৮৭১ সালে সৈন্য সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা হয়। তখন লুসাই বিদ্রোহ দমন করে বাহিনীটি।

পরবর্তী সময়ে ১৮৭৯ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার গার্ডস থেকে ‘স্পেশাল রির্জাভবাহিনী’ নামে এ বাহিনীর সদস্যগণ পিলখানায় প্রথম ঘাটি স্থাপন করে। সেই থেকে পিলখানাকে ঘিরেই রাইফেলসের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৮৯১ সালে ‘বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ নামে আবির্ভূত হয় এ বাহিনী। সেসময় ৪টি কোম্পানীতে বিভক্ত করা হয়। ১৯১২ সালে ‘ঢাকা মিলিটারি পুলিশ’, ১৯২০ সালে ‘বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন অব ইস্টার্ন ফ্যন্টিয়ার রাইফেলস্’। বাহিনীটির নাম আর পোশাক বদলের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ১৯৪৭ এ ভারত বিভক্তির পর এ বাহিনীর ‘ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর নামে পুরোদমে কাজ শুরু করে।

jagonews24

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালের ৩রা মার্চ ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) থেকে নাম বদলে বাংলাদেশ রাইফেলস্ বা বিডিআর নামে আবির্ভূত হয় নতুন উদ্যোমে। ১৯৮০ সালের ৩রা মার্চ রাইফেলস্ প্যারেড সপ্তাহ অনুষ্ঠানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বাংলাদেশ রাইফেলসকে প্রথম জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করেন।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা ট্রাজেডির পর ২০১০ সালের ৮ ডিসেম্বর মহান জাতীয় সংসদে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন ২০১০’ পাস হওয়ার মাধ্যমে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি নামে কাজ শুরু করে সীমান্তরক্ষী এ বাহিনী। ওই বছরে ২০ ডিসেম্বরকে বিজিবি দিবস হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়।

এদিকে ২০০৫ সালে তৎকালীন ৩৩ রাইফেল ব্যাটালিয়ন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবির সুতিকাগার রামগড়ে স্থাপন করে সীমন্তরক্ষী এ বাহিনীর দৃষ্টিনন্দন বিশাল জন্ম-স্মৃতিস্তম্ভ। যা ওই বছরের ৬ জুন বাংলাদেশ রাইফেলস্ এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, এনডিসি, পিএসসি উদ্বোধন করেন।

স্মৃতিস্তম্ভ বেদিতে বিজিবির জন্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখা ছাড়াও পোড়া মাটি দিয়ে তৈরি এ বাহিনীর বিবর্তনের ৮টি অবয়ব বা টেরাকোটা স্থাপন করা হয়েছে। খাগড়াছড়িতে আগত পর্যটকরা রামগড় সদরের ভারত সীমান্তঘেঁষা অফিস টিলা এলাকায় অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন এ বিশাল ‘রাইফেলস্ স্মৃতিস্তম্ভ’ ঘুরে দেখেন আর জেনে নেন এ বাহিনীর সুদীর্ঘকালের গৌরবময় ইতিহাস।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবির জওয়ানদের আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে রামগড়ে রিক্রটিং (লোকভর্তি) কেন্দ্র এবং বিজিবির জাদুঘর স্থাপনের দাবী জানিয়েছে রামগড়ের সচেতন মহল। রামগড়ের স্থানীয় সংবাদকর্মী মো. নিজাম উদ্দীন লাভলু বলেন, দেশ মাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিয়োজিত এ বাহিনীর সুতিকাগার এ রামগড়েরই। তাই বিজিবি আর রামগড় অবিচ্ছেদ্য। রামগড়ের মাটিতে জন্ম নেয়া ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ থেকেই আজকের বিজিবি।

এদিকে দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি। সারাদেশের ন্যায় বিজিবির গুইমারা সেক্টর আয়োজন করেছে বর্ণিল অনুষ্ঠানের। এমনটাই জানিয়েছেন বিজিবির গুইমারা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. আবদুল্লাহ আল মামুন। দিবসটি উপলক্ষে সেক্টর সদর দপ্তর ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন সদরে দোয়া মাহফিল, পতাকা উত্তোলন, দরবার, প্রীতিভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মুজিবুর রহমান ভুইয়া/এফএ/আরআইপি