ইসলামী ব্যাংকের অর্ধশতাধিক গ্রাহক প্রতারণার শিকার
ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্মীপুরের রায়পুর শাখায় অর্ধশতাধিক গ্রাহক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। নুর মোহাম্মদ নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা ওই গ্রাহকদের সঙ্গে ত্রিমুখী প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করে। গত শুক্রবার প্রতারণার শিকার হয়ে হতাশাগ্রস্ত এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হলে অন্যরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন।
এ নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে প্রতারিত ক্ষুব্ধ ৫৮ জন গ্রাহক রায়পুর শহরের একটি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে বৈঠকে বসেন। গত দুই বছর ধরে ভুয়া ঋণ দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি গ্রাহকের কাছ থেকে কৌশলে চেক নিয়ে টাকা উত্তোলন ও গ্রাহকদের টাকা হিসাবে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন।
এসব অভিযোগে ব্যাংকটির এসবিআইএস সুপাভাইজার নুর মোহাম্মদকে গত ৭ সেপ্টেম্বর দুদক গ্রেফতার করেছে। তখন ১৮৬ জন গ্রাহকের নামে ভুয়া ঋণ (বিনিয়োগ) ও গ্রাহকের ৮ কোটি ৯৭ লাখ ১ হাজার ২১৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়। তিনি বর্তমানে জেলা কারাগারে রয়েছেন।
গত শুক্রবার প্রতারণার শিকার গার্মেন্টস ব্যবসায়ী আবু মহসিন টেলু দেওয়ানজী মৃত্যুবরণ করেছেন। তার বড় ভাই আপেল মাহমুদের অভিযোগ, ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা টেলুর নামে ৪৬ লাখ ভুয়া ঋণ করেন। পরে টেলুর হিসাবে তার ৪৬ লাখ টাকা জমা হওয়ার কথা বলে চেক নিয়ে টাকাগুলো উত্তোলন করে নেয় নুর মোহাম্মদ। গ্রেফতারের পর তিনি ভুয়া ঋণ ও গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেন।
প্রতারণার বিষয়টি ব্যাংকের সংশ্লিষ্টদের জানিয়েও সুফল পাচ্ছেন না তিনি। দফায় দফায় দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
প্রতারণার শিকার মো. বোরহান উদ্দিন জানান, নুর মোহাম্মদ গত কয়েক বছর ধরে ব্যাংকের রায়পুর শাখায় কর্মরত ছিল। গ্রাহকদের সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ভুয়া ঋণ তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি। সিসি ঋণের গ্রাহকরা তাদের হিসাবে টাকা জমা করলেও শুধুমাত্র জমা ভাউচারে স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে রাখা হলেও তা হিসাবে জমা করা হয়নি।
ঋণ নবায়নের কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অলিখিত চেকে স্বাক্ষর করিয়ে রেখে পরে ওই চেক ব্যবহার করে নিজের ইচ্ছামতো টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন নুর মোহাম্মদ। এভাবে ৫৭ জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রায়পুর শহরের হাজী আলী আকবর সুপার মার্কেটের দেওয়ানজী বস্ত্র বিতানের আবু মহসিন টেলু দেওয়ানজীর (সিএ-৮৭৯) ৪৬ লাখ টাকা, হায়দরগঞ্জের মো. মাইনুদ্দিনের সিয়াম এন্টার প্রাইজের (সিএ-৭২১) ৩৬ লাখ, বোরহান উদ্দিনের আল আমিন এন্টারপ্রাইজের (সিএ-৩৫৮) ৩৭ লাখ, বাসাবাসি বাজারের ভুলু পাটওয়ারীর অভি ট্রেডার্সের (সিএ-৯৮৯) ১৯ লাখ ৫০ হাজার, নুর এন্টার প্রাইজের নামে ১৩ লাখ টাকা, বিল্লাল হোসেনের বিল্লাল স্টোরের ১৭ লাখ, আব্দুল মান্নানের মান্নান ট্রেডার্সের ৫৯ লাখ ৩৯ হাজারসহ ৫৭ জন গ্রাহকের টাকা প্রতারণার মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন। এসব গ্রাহকদের হিসাব নম্বরগুলো প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত হলেও গ্রাহকরা কেউ অবগত নয় বলে জানিয়েছেন।
কাউছার মাহমুদ বলেন, আমার বাবার নামে ৪৬ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করে ব্যাংক কর্মকর্তা। তার জন্য হতাশাগ্রস্ত হয়ে বাবাকে অকালেই চলে যেতে হয়েছে। প্রতারণার বিষয়টি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকতাদের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েও কোনো ফল না পাওয়ায় তিনি দুশ্চিন্তায় থাকতেন। প্রতারণার বিচারের পাশাপাশি আমরা এ হতাশা ও হয়রানি থেকে মুক্তি চাই।
এ ব্যাপারে ইসলামী ব্যাংকের রায়পুর শাখার ব্যবস্থাপক মো. মাহবুবুল হাসান বলেন, বিষয়টি জানতে পেরে আমরা আমাদের অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছি। তিনি এখন কারাগারে আছেন। তদন্তের ফলাফল পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে গ্রাহকদেরকে হয়রানি করা হচ্ছে না। আমরাও চাই তারা প্রতিকার ও তাদের টাকা-পয়সা ফেরত পাক।
কাজল কায়েস/এএম/আইআই