‘ঠান্ডা নাগলেও করার কিছু নাই, যে জিনিস পাতির দাম’
গত কয়েকদিন ধরে অব্যাহত শীত আর শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রংপুরের জনজীবন। দিনের বেলা কিছু সময়ের জন্য সূর্য়ের দেখা মিললেও রোদের তীব্রতা একেবারেই কম। কনকনে শীতের কারণে কাহিল হয়ে পড়েছে এ অঞ্চলের দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষগুলো। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় দুস্থ মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে কয়েকগুন।
বিশেষ করে নদী তীরবর্তী ও ছিন্নমূল মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে। খেটে খাওয়া দিনমজুরেরা তীব্র শীতকে উপেক্ষা করে গ্রাম থেকে শহরে ছুটে আসলেও কাজ না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।
ঘন কুয়াশা আর শীতের কারণে সকাল পেরিয়ে দুপুর গড়ালেও কাজ না পেয়ে বসে থাকছেন শ্রমজীবী মানুষগুলো। পেটের তাগিদে কেউ কেউ কাজে নামলেও শীতের তীব্রতায় নাভিশ্বাস উঠছে তাদের।
নগরীর চেকপোস্ট, শাপলা চত্বর, ধাপ শিমুলবাগ ও বেতপট্টি মোড় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে কাজের আশায় শহরে ছুটে এসেছেন শ্রমজীবীরা।
সকাল থেকে ডালি, কোদাল, খন্তা, দড়ি, দাসহ কাজের বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে অপেক্ষায় বসে থাকলেও ডাক আসছে না। দুই-একজনের ভাগ্যে কাজ জুটলেও অধিকাংশ শ্রমিকরা কাজ না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
নগরীর বেতপট্টি মোড়ে এদেরই একজন দিনমজুর মোসলেম উদ্দিন বেলা ১১টায় জাগো নিউজকে জানান, সাধারণত সকাল ৮ থেকে ৯টার মধ্যেই সবাই যার যার কাজে চলে যায়। আর কাজ না থাকলে বাড়ি ফিরে যান। কিন্তু শীতের কারণে অনেক বেলা হলেও কেউ কাজে ডাকছেন না। মাঝে মাঝে কাজ মেলে তাই বেলা ১১টা হলেও অপেক্ষায় আছেন তারা।
দিনমজুর শফিকুল জানান, যেখানে প্রতিনিয়ত ৪০ থেকে ৫০ জন মজুর এখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে যান সেখানে বেলা ১১টা পর্যন্ত ১০ জনেরও কাজ মেলেনি।
রিকশাচালক আনারুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বাড়িত বউ-ছাওয়াল (স্ত্রী-সন্তান) মিলি ৬ জন খাই। একদিন কাম (কাজ) না করলে হামার (আমাদের) বিপদ। তাই ঠান্ডা নাগলেও করার কিছু নাই। যে জিনিস পাতির (জিনিসপত্র) দাম, তাতে সংসার চলা খুব কষ্ট হয়া গেইচে (গেছে)।
শীতের কারণে নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলো কাজ না পেয়ে যেমন বেকায়দায় পড়েছেন তেমনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কমে গেছে ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম।

নগরীর হাড়িপট্টি রোড়ের ব্যবসায়ী এনামুল হক জাগো নিউজকে বলেন, হিমেল হাওয়া আর শীতের কারণে বাইরে থেকে লোকজন শহরে আসতে কষ্ট পাচ্ছেন। এ কারণে তাদের বেচাবিক্রিও কমে গেছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী জাগো নিউজকে জানান, একটু দেরিতে হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে এ অঞ্চলে শীতের বৃদ্ধি পেয়েছে। দিনে তাপমাত্রা একটু বেশি থাকলেও রাতে তা কমে আসছে। গত বৃহস্পতিবার দিনে সর্বনিম্ন ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, শুক্রবার ১০ দশমিক ২০ ডিগ্রি এবং সর্বশেষ শনিবার বেলা ৩ টায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ফরিদুল হক জাগো নিউজকে জানান, এ পর্যন্ত সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ১৮ হাজারসহ মোট ২৫ হাজার শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। আরও বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে তা বিতরণ করা হবে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, শীতজনিত কারণে আগের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
জেলা সিভিল সার্জন আবু মো. জাকিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, প্রতি বছরই শীত মৌসুম এলে রোগ-বালাই কিছুটা বাড়ে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে শিশু ও বৃদ্ধদের প্রতি সচেতন থাকতে হবে।
শীতার্ত মানুষের পাশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাসহ সমাজের বিত্তবানরা এখনই এগিয়ে না এলে চরম দুর্ভোগে পড়বে এ অঞ্চলের শীতার্ত মানুষ। তাই শীতার্তদের পাশে দাঁড়াতে বেসরকারি সংস্থাসহ বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
জিতু কবীর/এমএএস/পিআর