টাঙ্গাইলের ১৯৪৬ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই শহীদ মিনার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ০৬:৩২ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

পৃথিবীতে একমাত্র মাতৃভাষার জন্য আত্মদান করেছে বাঙালি জাতি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত।

২১ ফেব্রুয়ারি শুধু আমার বা আমাদের বাঙালির অহঙ্কার নয়। পুরো বিশ্বের অধিকার আদায়ের পথপ্রদর্শকও এখন বাংলা ভাষা। ১৯৯৯ সালে যার স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো।

মহান মুক্তিযুদ্ধে যেমন টাঙ্গাইলে বীরত্বগাথা ইতিহাস রয়েছে। তেমনি ৫২-এর ভাষা আন্দোলনেও রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। টাঙ্গাইলের অনেক বীর সন্তান ভাষা আন্দোলনে জাতীয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক অগ্রভাবে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

ভাষা আন্দোলনে টাঙ্গাইলে গড়ে উঠেছিল দুর্বার আন্দোলন। এখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন বদিউজ্জামান খান, সৈয়দ আবদুল মতিন, সৈয়দ নুরুল হুদা, শামসুর রহমান খান শাজাহান, মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল. আবু সাঈদ খান, হাতেম আলী তালুকদার, রমিনুজ্জামান খান রইজ, নারায়ন চন্দ্র বিশ্বাস. ঋষিকেশ পোদ্দার, হাবিবুর রহমান, বুলবুল খান মাহবুব, নাজমি আরা রুবি প্রমুখ।

৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে সরকারের হুলিয়া মাথায় নিয়ে তৎকালীন রমেশ হলের কাছে (বর্তমানে সাধারণ পাঠাগারের পশ্চিম পাশে) তারা টাঙ্গাইলে সর্বপ্রথম শহীদ মিনার স্থাপন করেন। বর্তমানে শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি তৃতীয় সংস্করণের রূপ।

তবে ভাষা আন্দোলনে টাঙ্গাইলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও জেলার ১৯৪৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই শহীদ মিনার। এতে দেশপ্রেম ও চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন ভাষা সৈনিকরা।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় সরকারি ও জাতীয়করণকৃত মোট ১৬২৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫১৬টিতে নেই শহীদ মিনার।

এর মধ্যে ঘাটাইল উপজেলার ১৭৩টির মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে রয়েছে শহীদ মিনার, সখিপুরে ১৫০টির মধ্যে ছয়টিতে, গোপালপুরে ১৬১টির মধ্যে সাতটিতে, বাসাইলে ৭৯টির মধ্যে তিনটিতে, টাঙ্গাইল সদরের ১৬৪টির মধ্যে ১৩টিতে, দেলদুয়ারের ১০০টির মধ্যে পাঁচটিতে, মির্জাপুরে ১৬৯টির মধ্যে সাতটিতে, কালিহাতীর ১৭২টির মধ্যে ২৬টিতে, মধুপুরে ১১০টির মধ্যে ১০টিতে, নাগরপুরে ১৫৬টির মধ্যে সাতটিতে, ভূঞাপুরে ১১০টির মধ্যে দুটিতে এবং ধনবাড়ীর ৮৫টির মধ্যে ২২টিতে মোট ১১৩টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার রয়েছে।

এদিকে জেলা শিক্ষা অফিসের অধীনে ৮০৫টি হাইস্কুল, কলেজ ও মাদরাসা রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩০টি প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল সদরের ৭৪টির মধ্যে মাত্র ১০টিতে রয়েছে শহীদ মিনার, বাসাইলের ৪০টির মধ্যে ১৫টিতে, কালিহাতীর ৮৩টির মধ্যে ২৭টিতে, সখিপুরের ৫৫টির মধ্যে ৩১টিতে, ঘাটাইলের ৪৯টির মধ্যে ২৫টিতে, গোপালপুরের ৭০টির মধ্যে ৪০টিতে, মধুপুরের ৯২টির মধ্যে ৩৮টিতে, ধনবাড়ীর ৫৬টির মধ্যে ২৫টিতে, মির্জাপুরের ৭৯টির মধ্যে ৪৯টিতে, দেলদুয়ারের ১০৬টির মধ্যে ৫০টিতে, নাগরপুরের ৪১টির মধ্যে ২৭টিতে ও ভূঞাপুরের ৬০টির মধ্যে ৩৮টিতে মোট ৩৭৫টি প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার রয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ বলেন, বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্যে সরকারিভাবে বরাদ্দ নেই। শিশুদের মনে মাতৃভাষার যথাযথ ইতিহাস তুলে ধরার জন্য শিক্ষাখাতের বরাদ্দ থেকে কিংবা বিত্তবানদের সহযোগিতায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ প্রয়োজন।

টাঙ্গাইলের ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রখ্যাত কবি বুলবুল খান মাহবুব বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়েছিল ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। যা সারাবিশ্বে এখন পালিত হয়। ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের বহু বছর চলে গেলেও টাঙ্গাইলের এতোগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার না থাকা অত্যন্ত লজ্জার ও হতাশাজনক। এতে আমাদের দেশপ্রেম ও বাঙালির চেতনাবোধ প্রশ্নবিদ্ধ। আইন করে হলেও মাদরাসাসহ প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা উচিত।

এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) আশরাফুল মমিন বলেন, জেলার এতগুলো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই এ সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের জানা ছিল না। মাদরাসাসহ প্রতিটি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার থাকা উচিত। প্রতিষ্ঠানগুলোতে শহীদ মিনার নির্মাণ করার জন্য আমরা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুপ্রাণিত করবো। সেইসঙ্গে এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিগোচর এবং আর্থিক সহযোগিতার জন্য মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করা হবে।

আরিফ উর রহমান টগর/এএম/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।