কবিরাজের গুজবে কান দিয়ে ঘরবন্দি গ্রামবাসী

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জয়পুরহাট
প্রকাশিত: ০৬:১৩ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গন্ডিমসারা গ্রামে কুকুরের কামড়ে প্রভাষ চন্দ্র দাস নামে এক ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর গণক কবিরাজ এ নিয়ে গ্রামবাসীর মধ্যে গুজব ছড়ান।

ওই কবিরাজ গুজব ছড়ান, মৃত প্রভাষ চন্দ্রের বিষ প্রবেশ করেছে গ্রামের শিশুসহ সবার শরীরে। এমন গুজবে কান দিয়ে প্রাণভয়ে দিশেহারা গ্রামবাসী ঝাড়ফুঁক, পানি পড়া, গুড় পড়াসহ প্রাচীন যুগের নানা অপচিকিৎসা নিচ্ছেন।

সেইসঙ্গে শিশুদের স্কুলে যেতে দিচ্ছেন না অভিভাবকরা। এমন গুজবের খবরে স্থানীয়দের চিকিৎসা দিতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার গন্ডিমসারা গ্রামের বাসিন্দাদের অধিকাংশ নিরীহ আর সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ। এই গ্রামের প্রভাষ চন্দ্র নামে এক ব্যক্তিকে ৪/৫ মাস আগে কুকুর কামড় দিলে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সোমবার জলাতঙ্ক রোগে মারা যান তিনি। তার মারা যাওয়ার পর গণক কবিরাজ গ্রামে এসে গুজব ছড়ান, গ্রামের শিশু, নারী-পুরুষসহ প্রায় সবার শরীরে প্রবেশ করেছে মৃত প্রভাষের কুকুরের বিষ।

গন্ডিমসারা গ্রামের শিবেন দেবনাথ, বাচ্চু মন্ডল, মিলন ইসলামসহ গ্রামবাসীরা জানায়, গণক কবিরাজের এমন গুজবে দিশেহারা গ্রামবাসী। ঝাড়ফুঁক, পানি পড়া, গুড় পড়াসহ নানা চিকিৎসা নিচ্ছেন। কবিরাজের কথা মতো তাদের অধিকাংশের শরীরে এরই মধ্যে বিষ প্রবেশ করেছে। এ অভিশাপ থেকে বাঁচতে তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে বিষ বের করতে হবে। তা না হলে অল্প দিনের মধ্যে ওই অভিশপ্ত বিষক্রিয়ায় আক্রান্তরা মারা যাবে। তাই সন্তানদের বিষযুক্ত বাতাস থেকে রক্ষা করতে বাড়ির বাইরে বের হতে দিচ্ছেন না অভিভাবকরা। সেইসঙ্গে কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। বলতে গেলে গ্রামের সবাই ঘরবন্দি।

গন্ডিমসারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অরুনা কান্তি সরকার জানান, কবিরাজের গুজবের কারণে অভিভাবকরা শিশুদের স্কুলে যেতে না দেয়ায় ওই বিদ্যালয়সহ আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আশঙ্কাজনকভাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে।

jai

গন্ডিমসারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রিফাত হাসান, পার্শ্ববর্তী গোপীনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র অনিক দেবনাথ, গোপীনাথপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী নুপুর রানী সরকারসহ গন্ডিমসারা গ্রামের অনেক শিশু জানায়, হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো বিষক্রিয়ার ভয়ে মা-বাবারা তাদের স্কুলে পাঠায় না। সারাদিন বাড়িতে থাকতে বলেন।

মৃত প্রভাষের স্ত্রী অর্চনা রানী, ছেলে পরিতোষ কুমার ও পরিতোষের স্ত্রী রত্না রানী জানান, একদিকে জলাতঙ্ক রোগের গুজবে মৃত্যু ভয়ে গ্রামবাসীদের নির্ঘুম অবস্থা, অন্যদিকে মৃত প্রভাষের পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে গ্রামের মানুষ। এতে একঘরে হয়ে পড়েছে প্রভাষের পরিবার।

তবে শত চেষ্টা করেও দেখা মেলেনি সেই অভিযুক্ত কবিরাজের। কবিরাজের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধার কারণে এখনও তার পরিচয় জানায়নি গ্রামবাসী।

আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রাধে শ্যাম আগরওয়ালা ও আক্কেলপুর থানা পুলিশের ওসি সিরাজুল ইসলাম জানান, এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন গ্রামবাসীদের মাঝে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। সেইসঙ্গে গুজবে কান না দিতে সবাইকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ছড়ানো সেই কবিরাজের খোঁজে মাঠে রয়েছে পুলিশ।

রাশেদুজ্জামান/এএম/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :