রাত ১০টা বাজলেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ৩৮ গ্রামের মানুষ

রিপন দে
রিপন দে রিপন দে মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৫:৫০ পিএম, ১৬ মার্চ ২০১৮

দশম শ্রেণির ছাত্রী তারিন গত ৬ মার্চ সকালে এলাকার সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনাবশত সেদিন সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে সে গুরুতর আহত হয়। বর্তমানে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তারিন।

তারিনের স্বজনরা জানাল, কয়েক দিন পর পরই এমন ঘটনা ঘটছে। সাঁকো থেকে পড়ে কারও পা ভাঙছে, কারও ভাঙছে হাত। বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা এ ঘটনার শিকার বেশি হচ্ছে। আর এ ভয়ে ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থীই লেখাপড়া ছেড়ে জড়িয়ে পড়েছে অন্য কাজে।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাজিরবাজার সংলগ্ন মনু নদীর উপর তৈরি করা হয়েছে ৬শ ফুট লম্বা এই সাঁকো। প্রতিবছর বর্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে পারাপারের সময় নৌকাডুবি থেকে রক্ষা পেতে তৈরি করা হয়েছে এটি। তারপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বর্ষাকালে ওই নদীতে নৌকা আর শীতকালে সাঁকো দিয়ে পারাপার হচ্ছে ছাত্রছাত্রীসহ লক্ষাধিক মানুষ।

মনু নদীতে একটি সেতুর অভাবে মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর ও সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে ওই ৩ উপজেলার ৩৮টি গ্রামের স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যাতায়াতের অভাবে লেখাপড়া ও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

Molvibazar-(2)

বর্ষাকালে রাতের বেলায় নদী পারাপারের নৌকা মেলে না, তাই দূর-দুরান্ত থেকে বাড়ি ফিরতে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। গর্ভবতী নারীসহ শিশুদের জরুরি চিকিৎসার জন্য যখন তখন শহরে না আসতে পারার কারণে বেড়ে গেছে মৃত্যু ঝুঁকিও। এসব কারণে পিছিয়ে রয়েছে বৃহত্তর ওই অঞ্চলটি।

ওই জায়গায় সেতু নির্মাণের জন্য এলাকাবাসীকে স্বাধীনতার পর থেকে যখন যে সরকার ক্ষমতায় গেছে তারাই আশ্বাস দিয়েছে কিন্তু ভোটের পর আর কেউ কথা রাখেনি। অনেক আবেদন তদবির করেও কোনো সুফল পায়নি ৩৮টি গ্রামের মানুষ।

কাজিরবাজারের ব্যবসায়ী বদরুল হাসান জোসেফ জানান, প্রায় ৬শ ফুট দীর্ঘ মনু নদীর ওই জায়গা দিয়ে পারাপারের জন্য এলাকাবাসী নিজেরা চাঁদা তুলে বর্ষায় নৌকা ঠিক করে রাখে আর শীতে তৈরি করা হয় বাঁশের সাকো। বর্ষা মৌসুমে ২টি নৌকা এবং শুকনা মৌসুমে পাশাপাশি ২টি সাঁকো দিয়ে পারাপার হন ওই ৩ উপজেলার ৩৮ গ্রামের লক্ষাধিক নারী-পুরুষ। বর্ষা মৌসুমে সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নদীতে নৌকা পাওয়া যায়। রাত ১০টার পরে ওই নদীতে মাঝি থাকেন না। মাঝি না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় বাজার করতে আসা, শহর থেকে ফিরে আসা ও অন্যান্য জায়গা থেকে বাড়ি ফেরা মানুষগুলো। বিকল্প উপায়ে বাড়ি ফিরতে হলে ৫/৬ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয় অথবা নদী পারে বসে রাত্রি যাপন করতে হয়।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক এবাদুল হক দুলু জাগো নিউজকে জানান, একটি সেতুর জন্য হাজারও ছাত্র-ছাত্রী বিপাকে। শীতে মোটামুটি ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি থাকলেও বর্ষায় নদী পারাপারের ভয়ে উপস্থিতি থাকে হাতে গোনা।

Molvibazar-(3)

সাঁকো থেকে পরে আহত তারিনের বাবা মুহিত মিয়াসহ অনেক অভিভাবক জাগো নিউজকে জানান, বর্ষা মৌসুমে নৌকায় পারাপার হতে গিয়ে নদীতে নৌকা ডুবে যায়। ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয়। যার কারণে ছেলে-মেয়দের সময় মতো ক্লাসে ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না। সমস্যা যেহেতু নিজেই দেখছি তাই স্কুলে যেতে ছেলে-মেয়েদের চাপ দিতে পারি না।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার সদর উপজেলা চেয়ারম্যন ভিপি মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, এই সেতুর জন্য আমি নিজেও বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করেছি এবং বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার (সদর-রাজনগর) সংসদ সদস্য ও প্যানেল স্পিকার সৈয়দা সায়রা মহসিন জাগো নিউজকে বলেন, আমি এই সেতুর ব্যাপারে সংসদে দাবি জানিয়েছি। আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি সেতুটির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এমএএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।