সিরাজগঞ্জে বেড়েই চলছে অটিজম শিশুর সংখ্যা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত: ০১:২২ পিএম, ০২ এপ্রিল ২০১৮

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলায় তাঁতের সুতার কাজে ব্যবহৃত বিষাক্ত বর্জ্য আর পানি এ এলাকার ভূগর্ভের নলকুপের পানির সঙ্গে মিশে খাবার পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। এই মারাত্মক দূষিত পানি পানের কারণে মাতৃগর্ভ থেকেই অটিজম শিশুর জন্ম হচ্ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, তাঁত শিল্পের কারণে এলাকায় দিনদিন বেড়ে চলছে অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুর হার। কিন্তু এ সমস্যার সমাধানে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তবে বিষয়টি শুধু একবার করে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস পালনের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ না থেকে অটিজম ও প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে কর্তৃপক্ষ তা নির্মূলের ব্যবস্থা নেবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, তাঁত ও বস্ত্রশিল্পের জন্য দেশের অন্যতম সিরাজগঞ্জ জেলা। তাঁত শিল্পের জন্য ব্যবহৃত সুতা রং এর বর্জ্য মিশ্রিত বিষাক্ত পানি এলাকার জলশায়গুলোতে ফেলে। দীর্ঘদিন যাবৎ এই বর্জ্য ফেলার কারণে জলাশয় ভর্তি হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে কারখানার মালিকেরা পাইপ দিয়ে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে মিশিয়ে দিচ্ছে। যে কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে। এসব এলাকার নলকুপ চাপলেই এখন দূষিত পানি উঠে আসছে। আর এরকম ভয়ানক রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত পানি প্রতিনিয়ত পান করছে এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। যার ফলে গর্ভবতী মায়েরা অটিস্টিক আর প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম দিচ্ছে। এ অঞ্চলের বেশ কিছু নলকূপের পানির নমুনা সংগ্রহ করে সিরাজগঞ্জ জনস্বাস্থ্য অধিদফতর ও রাজশাহী জোনাল ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় পানিতে মারাত্মক ডিজল অক্সিজেন, মেগানিস, ফসফেট, শিশা, মাত্রা অতিরিক্ত আয়রন ও আর্সেনিক পাওয়া গেছে। যা মানব শরীরের জন্য বিশাল হুমকিস্বরূপ বলে কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

jagonews24

বেলকুচি উপজেলার গাড়ামাসি গ্রামের শহিদুল্লাহ দম্পতি জানান, তাদের বাড়ির চার পাশে সুতা রং এর ডাইং ও প্রসেস মিল রয়েছে। এসব মিলের বর্জ্যযুক্ত রঙিন পানি তার বাড়ির চাপকলে পানিতে উঠে। এ পানিতে দুর্গন্ধ থাকলেও বাধ্য হয়েই পান করতে হয়। যে কারণে তার ৬ বছরের শিশু কন্যা এশামনি এই অটিজমের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করেছেন এশামনির চিকিৎসক। এ জন্য শহিদুল্লাহ দম্পতি পরবর্তী সন্তান নিতেও ভয় পাচ্ছে।

চালা গ্রামের সাইফুল দম্পতি জানান, আজ থেকে সাত বছর আগে তাদের ঘরে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয় অটিজমের শিকার হয়ে। দেশের নামি দামি হাসপাতালের বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েও কোন লাভ হয়নি। চিকিৎসক বলেছেন তার বাড়ির নলকূপের পানি আর পান করা যাবে না। এরপরেই বাড়ির পানি নিয়ে পরীক্ষা করে করলে এতে মারাত্মক ফসফেট, শিশা ও মাত্রা অতিরিক্ত আয়রন ও আর্সেনিক পাওয়া যায়।

বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওলিউজ্জামান জানান, এ অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যে তামাই ও সমেশপুর গ্রামে দুটি পানি শোধাগার যন্ত্র বসিয়ে এই এলাকার মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আরও বাড়ানো হবে। আর প্রতিবন্ধী ও অটিজমের শিকার শিশুদের সরকারি ভাতা এবং সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

jagonews24

সিরাজগঞ্জ জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদার জানান, তাঁত সমৃদ্ধ জেলা সিরাজগঞ্জ। এসব তাঁত শিল্প এলাকার সুতা রং কারার প্রসেস ও ডাইং মিলের বিষাক্ত বর্জ্য মিশ্রিত পানি সরাসরি নলকূপের পাইপ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে মিশিয়ে দিচ্ছে অসাধু মিল মালিকরা। ।

সিরাজগঞ্জ সরকারি শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এবং শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. রেজাউল ইসলাম জানান, যদি কোন গর্ভবতী মা কিংবা শিশু ডিজল অক্সিজেন, মেগানিস, ফসফেট, শিশা, মাত্রা অতিরিক্ত আয়রন ও আর্সেনিক যুক্ত পানি পার করে তা হলে ওই গর্ভবতী মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় সন্তান অটিজমের শিকার হতে পারে আবার ছোট শিশুরাও যদি এ পানি পান করে তাহলে তাদেরও সম্ভাবনা থাকে যায়।

সিরাজগঞ্জ-২ (সদর-কামারখন্দ) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত মুন্না জানান, ভূগর্ভস্থ পানির যথাযথ পরীক্ষার জন্য সরকারের উচ্চ মহলকে কাজ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। সেই সঙ্গে জেলার সদর হাসপাতালে অটিজম ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা বিভাগ খোলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ইউসুফ দেওয়ান রাজু/আরএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।