সাজেদার ছেলে আয়মনের লাগামছাড়া উৎপাত

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০১:৪৪ পিএম, ২৬ মে ২০১৮ | আপডেট: ০১:৫৬ পিএম, ২৬ মে ২০১৮
ফুল হাতে আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলু।

টানা আট বছর ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য রয়েছেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। প্রায় পাঁচ বছর যাবৎ তিনি অসুস্থ থাকায় তার এলাকা দেখ-ভালের দায়িত্বে ছিলেন তার ছেলে আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলু। আর সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে আয়মন আকবর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর এপিএস পদ থেকে অপসারণ করা হয় আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলুকে।

এমনকি ছেলে আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলুর কারণে গুলশানের সরকারি বাড়িও ছেড়েছেন জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। বাবলুর ওপর রাগ করে তিনি গত ১৮ মার্চ ওই বাড়ি ছেড়ে ধানমণ্ডিতে ছোট ছেলে শাহদাব আকবর লাবুর ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠেছেন বলে একটি জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ওই দিনই অন্য তিন ছেলে-মেয়েসহ গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নালিশও করেছেন তিনি বড় ছেলের বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, আয়মন আকবর বাবলু এলাকায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী যেটা এলাকায় ‘মামা বাহিনী’ নামে পরিচিত। মামা বাহিনীর সদস্যরা অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে সালথা-নগরকান্দা উপজেলার সহস্রাধিক লোককে করেছে ঘরছাড়া। অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়ে বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে নিঃস্ব করেছে হাজারো পরিবারকে, হাতুড়ি পেটা করে পঙ্গু করেছে শত শত নিবেদিত প্রাণ আওয়ামী লীগ কর্মীকে। মাদক ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজী থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপকর্মের নেপথ্যে রয়েছেন মামা বাহিনী প্রধান বাবলু চৌধুরী।

সম্প্রতি ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস পালন না করে নিজের জন্মদিনের ভূড়িভোজের আয়োজন করে আলোচনায় আসেন এ ‘নেতা’ । ১৭ এপ্রিল তিনি তার ঢাকার বাসায় জন্মদিনের এই জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেখানে সালথা-নগরকান্দার তার সমর্থক হাইব্রিড আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। দলের একজন পদধারী নেতা হয়েও ঐতিহাসিক এমন দিবসে কোনো কর্মসূচি পালন না করে নিজের জন্মদিন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বেশ ক্ষুদ্ধ হন।

অভিযোগ রয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সালথা ও নগরকান্দা উপজেলায় মোট ৩৩টি ত্রাণ অধিদফতর থেকে ব্রিজ নির্মাণের বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু প্রতিটি ব্রিজের ঠিকাদারের কাছ থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা করে কমিশন নেন বাবলু চৌধুরী। ওই কমিশনের টাকা দিয়েই জন্মদিনের অনুষ্ঠানের খরচ চালানো হয়।

বাবলুর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গত বছরের পহেলা নভেম্বর ফরিদপুর প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ও এলাকাবাসী।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ২০০৯ সালে বর্তমান সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী তার বড় ছেলে ও সহকারী একান্ত সচিব আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলুকে তার রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন জনসভায় পরিচয় করিয়ে দেন। এর কিছুকাল পরই বাবলু আওয়ামী লীগের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী (মামা বাহিনী) গঠন করে সালথা-নগরকান্দা উপজেলায় সর্বত্র তার অশুভ প্রভাব বিস্তার করে।

তিনি বলেন, বাবলু চৌধুরীর মদদে এ সকল সন্ত্রাসীরা নিবেদিত প্রাণ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের কোণঠাসা করে রাখে। আর এর ফলে স্থানীয় আওয়ামী লীগে হাইব্রিড নেতা-কর্মীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। আওয়ামী লীগের আদর্শে অনুপ্রাণীত নেতা-কর্মীরা এ সকল হাইব্রিড আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করায় কয়েক হাজার নেতা-কর্মীকে মারধর করে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে অনেকের বসতভিটাসহ যাবতীয় মালামাল। দফায় দফায় বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে লুটে নেওয়া হয় তাদের সর্বস্ব। প্রতিবাদ করায় ওই সন্ত্রাসী বাহিনীর দ্বারা হাতুড়ি পেটার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, বাবলু চৌধুরীর মদদে বিএনপি থেকে আসা বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ওয়াহিদুজ্জামান, আরেক বিএনপি নেতা (বর্তমানে আওয়ামী লীগ কর্মী) মো. সাহিদুজ্জামান, সালথা বাজারের ঝাড়ুদারের ছেলে মামা বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড ও সালথা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. বাদল হোসেন, সালথা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে আওয়ামী লীগ কর্মী) চৌধুরী এমদাদ আলী খসরু, জামায়াতের রোকন মাহবুব আলীর ভাই টুটু চৌধুরী তাদের শতাধিক অনুসারী নিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছেন।

এই বাহিনীর হাতে লাঞ্ছিত হয়ে গৃহহারা হয়েছেন সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন, সংসদ উপনেতার সাবেক এপিএস মো. জামাল হোসেন মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা আবু শহীদ মিয়া, সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সরদার সাইফুজ্জামান বুলবুল, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. সানোয়ার হোসেন, ইভা সানোয়ার, জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক অরুণ কুমার মন্ডল।

সালথা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী সাব্বির আলী বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হয়েও আজ এই বাহিনীর অত্যাচারে আমরা বাড়িঘর হারিয়েছি। এই বাহিনী আমার বাড়ির সামনে কবর খুঁড়ে আমাকে জ্যন্ত কবর দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আমার মতো আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মীরা আজ মামা বাহিনীর অত্যাচারে দিশেহারা।

faridpur-(2)

এদিকে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নামের পাশে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ পদবী ব্যবহার শুরু করেন বাবলু চৌধুরী। এর আগে তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পদবীটি কখনোই ব্যবহার করেননি। কোনো সভা সমাবেশে তাকে অতিথি করা হলে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ পদবীটি যেন ব্যানারে লেখা হয় এটা ছিল তার নির্দেশ। কেউ তার এ নির্দেশ না মানলে তিনি ওই সভাতে উপস্থিত থাকতেন না। তাছাড়া কেউ তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মোধন না করলে সেই ব্যক্তিকে নাজেহাল করতেও ছাড়েননি। বাবলু চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধার নাম ব্যবহার করায় খোদ ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের মাঝেও ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছিল।

নিজের নামের পাশে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ লেখা নিয়ে এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন মহলের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর বাবলু চৌধুরী গত বছর থেকে নিজের নামের সঙ্গে সংযুক্ত মুক্তিযোদ্ধা খেতাব পরিহার করেন। এরপর থেকে কোনো সভা-সমাবেশের ব্যানারে তার নামের পাশে মুক্তিযোদ্ধা লেখা দেখা যায়নি।

বাবলু চৌধুরীর এসকল অপকর্ম নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন করায় স্থানীয় সাংবাদিকদের উপরও হামলা চালানো হয়। নূরুল ইসলাম নাহিদ নামের এক স্থানীয় সাংবাদিক এলাকা ছেড়ে এখন ফরিদপুর জেলা শহরে থাকেন।

নূরুল ইসলাম নাহিদ জানান, বাবলু চৌধুরীর বিভিন্ন অপকর্মের সংবাদ পরিবেশন করায় তার নির্দেশে তার লোকজন আমার উপর হামলা চালায় ও হত্যার হুমকি দেয়। এরপর থেকে আমি এলাকায় যাই না।

অপরদিকে মামা বাহিনীর একছত্র দাপটে অতিষ্ঠ এলাকার জনগণ সম্প্রতি প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। হামলা-পাল্টা হামলার বেশ কয়েকটি ঘটনাও ইতোমধ্যে ওই এলাকাগুলোতে ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে দুই ব্যক্তি, শতাধিক মানুষ আহত হয় এবং হামলা চালানো হয় বেশ কয়েকটি বাড়িতে।

অভিযোগ রয়েছে, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর অসুস্থতার সুযোগে বাবলু চৌধুরী এলাকায় বরাদ্দকৃত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প টেন্ডার না করেই কমিশনের টাকা নিয়ে মামা বাহিনীর সদস্যদের মাঝে কাজ বণ্টন করে থাকেন। বিশেষ করে টিআরজিআর, কাবিখা, কাবিটা, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ কাজ কে পাবে সেটা নির্ধারণ করে থাকেন বাবলু চৌধুরী। তার পছন্দের লোককে তিনি কমিশনের মাধ্যমে কাজ ভাগ বাটোয়ারা করে থাকেন।

এমনকি গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে ৮-১০ লাখ টাকার বিনিময়ে অযোগ্য প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিলেন বাবলু চৌধুরী। যার ফলে নগরকান্দা ও সালথায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছিল। নগরকান্দায় ৮৯টি ও সালথায় ৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও দুই দফায় দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী নিয়োগে জনপ্রতি ৪-৫ লাখ টাকা আদায় করে ঢাকায় বসে তালিকা তৈরি করে পাঠিয়ে দেন বাবলু চৌধুরী।

প্রশাসনের উপর চাপ প্রয়োগ করে সরকার কর্তৃক গম ক্রয়েও সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে না কিনে তার বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে গম ক্রয় করে থাকেন বাবলু চৌধুরী। সেখান থেকেও মোটা অংকের টাকা তিনি নিয়ে থাকেন। আর সালথা-নগরকান্দা উপজেলার এ সকল কাজের কমিশনের সমন্বয় করে থাকেন নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মিয়া, নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও ফুলসুতি ইউপি চেয়ারম্যান আরিফ হোসেন, সালথা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মামা বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড বাদল হোসেন এবং বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারী সালথা উপজেলা চেয়ারম্যান ওয়াহিদুজ্জামান।

বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারী সালথা উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, রাজনীতি করলে অনেক ক্ষেত্রে সত্য কথা বলা যায় না। ফরিদপুরের সালথা-নগরকান্দার রাজনীতিতে এ বাস্তবতা রয়েছে। এখানকার আওয়ামী লীগ দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি মামা গ্রুপ অপরটি মামা বিরোধী। আমি পড়েছি মামার দলে। এই এলাকা অনেক আগে থেকেই দাঙ্গাপ্রবণ এলাকা। আমাদের প্রত্যাশা ছিল মামা বাবলু চৌধুরীর নেতৃত্বে এই চরিত্রের পরিবর্তন ঘটাতে পারব। কিন্তু সেক্ষেত্রে আমরা ব্যার্থ হয়েছি।

এ ব্যাপারে নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ উপনেতার সাবেক এপিএস আয়মন আকবর চৌধুরী বাবলুর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এফএ/জেআইএম