সন্ধ্যা হলেই অভিভাবকদের ফোনে কল দেন তিনি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৭:২৪ পিএম, ৩১ জুলাই ২০১৮

নিজের সরকারি দায়িত্বের বাইরেও সমাজের জন্য যে অনেক কাজ করা যায় এবং কাজের মাধ্যমে একজন সরকারি কর্মকর্তা যে সাধারণ মানুষের প্রিয়জন হতে পারেন তার বাস্তব উদাহরণ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হক।

মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ২০১৬ সালের ৫ মে কমলগঞ্জে যোগদান করেন। যোগদানের পরপরই তিনি দায়িত্বের বাইরে অনেক সৃজনশীল কাজ করে ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তা থেকে পরিণত হয়েছেন জনতার ইউএনও হিসেবে।

১৬টি নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস কমলগঞ্জ উপজেলায়। মাহমুদুল হক বিশাল চা জনগোষ্ঠীসহ প্রতিটি নৃ-গোষ্ঠীর কাছে হয়ে উঠেছেন আপনজন। বিশাল চা জনগোষ্ঠীসহ অনেক দরিদ্র নৃ-গোষ্ঠী থাকার পরেও তার ব্যক্তিগত চেষ্টায় সিলেট বিভাগের ৪৯টি উপজেলার মধ্যে শিক্ষা থেকে পর পর দুই বছর সবচেয় কম ঝরেপড়া উপজেলা র্নিবাচিত হয়েছে কমলগঞ্জ। কোনো শিক্ষার্থী লেখাপড়া বাদ দিলে ইউএনও মাহমুদুল হকের কাছে কৈফিয়ত দিতে হয়। তিনি অভিভাকদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে একেক দিন একেক এলাকায় কথা বলে সন্তানদের লেখাপড়ার খোঁজ-খবর নেন।

বিশেষ খেয়াল রাখেন দরিদ্র শিক্ষার্থীদের। পিছিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অবহেলিত চা শ্রমিকদের উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিবাহ রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন, নির্যাতিত নারী ও দূরবর্তী নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বাইসাইকেল বিতরণ, ইভটিজিং প্রতিরোধে ভূমিকা রাখাসহ উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

Mahamudul

শিক্ষার উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রাখায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষা পদকে ভূষিত হন তিনি।

নারী উন্নয়নে নানান ভূমিকা রাখার জন্য ‘জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস’ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে তিনি জনপ্রশাসন পদক-২০১৮ গ্রহণ করেন। সব থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে তিনি কাজ করছেন নারীর ক্ষতায়ন এবং দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য।

গত ২৪ জুলাই জাগো নিউজে ‘পিতৃহীন আমিনার স্বপ্ন পূরণ হবে কি’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি কমলগঞ্জের ইউএনও মোহাম্মদ মাহমুদুল হকের নজরে আসে।

সংবাদটি পড়ে তিনি আমিনার বিস্তারিত খবর নিয়ে আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে তার অফিসে ডেকে আনেন। আমিনার সঙ্গে আলাপ করে তার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন এবং বলেন সে যেন আর্থিক চিন্তা না করে এবং মনযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে। তার আর্থিক সমস্যার জন্য লেখাপড়া বন্ধ হবে না। আর্থিক সমস্যার সমাধান তিনি করে দেবেন। তাক্ষণিকভাবে তিনি ভর্তির জন্য ৪ হাজার টাকা আমিনার হাতে তুলে দেন।

Mahamudul

ইউএনও মাহমুদুল হক জাগো নিউজকে জানান, উপস্থিত সময়ে আমি তাকে ৪ হাজার টাকা ভর্তির জন্য দিয়েছি। তার লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ কীভাবে অব্যাহতভাবে যোগান দেয়া যায় সেটা আমি গুরুত্বে সঙ্গে ভাবছি। টাকার অভাবে তার লেখাপড়া বন্ধ হবে না। এর আগে গত ২২ মে কমলগঞ্জের আরেক মেধাবী নিবারণকে নিয়ে ‘নিবারণের কষ্ট নিবারণ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে জাগো নিউজ। সেই সংবাদও তার দৃষ্টিতে পড়ে। নিউজ পড়ে তিনি নিবারণের দিকেও সাহায্যের হাত বাড়ান। অনেক কারণে এখন উপজেলার শিক্ষার্থীদের কাছে প্রিয় নাম মোহাম্মদ মাহমুদুল হক।

অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি বিভিন্ন স্কুলের অভিভাবকদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে লিখে রেখেছেন নিজের ডায়েরিতে। অবসর সময়ে সন্ধ্যার পর একেক দিন তিনি একেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের নম্বরে কল দিয়ে কথা বলেন। জানতে চান এই মুর্হূতে আপনার ছেলে-মেয়ে পড়ার টেবিলে আছে কি-না? কথা বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গেও। তাদেরকে উৎসাহ দেন লেখাপড়া চালিয়ে যাবার। কখনও কখনও চুপি চুপি স্বশরীরে উপস্থিত হন শিক্ষার্থীদের বাড়িতে। নিজের পরিবারের সদ্যসের মতো করে খেয়াল রাখেন উপজেলার ছাত্র-ছাত্রীদের।

Mahamudul

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাহমুদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, কোনো অভিভাবকের নম্বরে কল দিয়ে যদি শিক্ষার্থীদের না পাই তখন বুঝিয়ে বলি লেখাপড়ার গুরুত্ব। কয়েকদিন পর আবারও কল দিয়ে খোঁজ নেই সন্ধ্যার পর সে বা তারা পড়ার টেবিলে আছে কি-না।

পাহাড়ি এলাকার মেয়েদেরকে স্কুলে আসতে হয় ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার দূর থেকে। তাই তারা নিয়মিত স্কুলে যাওয়া-আসা করতে পারতো না। এসব মেয়েদের কথা চিন্তা করে মাহমুদুল হক উপজেলার কয়েকটি স্কুলের মেয়েদের মাঝে সাড়ে ৪শ’ বাইসাইকেল বিতরণ করেছেন। ফলে এলাকার মেয়েরা এখন নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে।

Mahamudul

উপজেলার তেঁতইগাঁও রশিদ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী বিরাজমনি জানায়, স্কুলে আসতে পাঁচ কিলোমিটার পথের পুরোটাই হাঁটতে হতো। দুর্গম কামার ছড়া চা বাগানের পথে পথে ছিল নানান বিড়ম্বনা। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হতো, ক্লান্ত শরীর নিয়ে পড়ার টেবিলে মনযোগ দেয়া সম্ভব হতো না। এখন নিয়মিত স্কুলে যাই। পথে পথে ইভটিজিংয়েরও ভয় নেই।

উপজেলার গকুল নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র আজয় দেবনাথের বাবা হরেন্দ্র দেব নাথ জানান, ইউএনও সাহেব আমার সঙ্গে যেমন কথা বলেন, তেমনি আমার ছেলের সঙ্গেও ফোনে কথা বলে। কল করে কোনো সমস্যা আছে কীনা জানতে চান তিনি।

মুন্সীবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্রী ফাতেমা জান্নাত ঝর্নার বাবা আব্দুল হান্নান জানান, ইউএনও সাহেব কিছুদিন পরপর মোবাইল ফোনে আমার মেয়ের লেখাপড়ার খবর নেন যা আমাকে মেয়ের লেখাপড়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়।

স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মতিন জানালেন, ইউএনও মাহমুদুল হকের কারণে নারী শিক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে নারী শিক্ষার হার।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম ইউএনও মাহমুদুল হক সর্ম্পকে জাগো নিউজকে বলেন, মাহমুদুল হক একজন সৎ এবং সৃজনশীল কর্মকর্তা। তিনি অনেক ভালো কাজ করছেন। এবং এই ভালো কাজের জন্য ইতোমধ্যে বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন।

রিপন দে/এমএএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।