প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন বিধবা নারী

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মানিকগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৯:০৮ পিএম, ২৭ আগস্ট ২০১৮

কৌশলে ভিটেমাটি লিখে নিয়ে প্রতিবন্ধী মেয়েসহ এক বিধবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ ওঠেছে আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে।

ঘরের টিন আর হাড়ি-পাতিল নিয়ে অসহায় মা-মেয়ে ১৫ দিন ধরে রাস্তায় পড়ে থাকলেও আশ্রয় মিলছে না কোথাও। ভাইয়ের ছেলে আলমগীর হোসেন বিয়ের প্রলোভনে প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে (২৫) ধর্ষণও করেছে একাধিকবার।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার মহাদেবপুর ইউনিয়নের সাহেলী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় গতকাল রোববার রাতে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন বিধবা ওই নারী (৭৬)।

সরেজমিনে সাহিলী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিধবা ওই নারী তার প্রতিবন্ধী মেয়ে রাস্তায় বসে কান্নাকাটি করছেন। রাস্তার পাশে একটি ভাঙা নৌকার উপরে রাখা হয়েছে হাড়ি-পাতিল এবং ঘরের টিন।

ওই বিধবা জানান, ১৫ বছর আগে তার স্বামী মারা যান। একমাত্র ছেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তারও আগে। এরপর থেকেই প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে নিয়ে স্বামীর ভিটায় বসবাস করতেন তিনি। মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় কাজ করতেন। সেই কষ্ট দেখে দুই বছর আগে ছোট ভাই মকর আলী দেখাশুনার কথা বলে তাদের বাড়িতে নিয়ে যান। ছোট্ট একটা ছাপড়া ঘর তুলে মেয়েকে নিয়ে সেখানেই বসবাস করতেন তিনি।

manik-2

কিছুদিন না যেতেই মকর ও তার ছেলে আলমগীর বিধবাকে বাড়ি লিখে দেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। নানাভাবে ভয়-ভীতিও দেখান তারা। তারাই কাগজপত্র সব ঠিক করে এসে একদিন বিধবা ও তার মেয়ের স্বাক্ষর নিয়ে যান। পরে জানতে পারেন মকর তার ১৭ শতাংশের বাড়িটি লিখে নিয়েছেন। প্রতিবাদ করলে তাদের জানে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়।

ওই বিধবা বলেন, আলমগীর তার প্রতিবন্ধী মেয়েটিকে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে। মেয়ের কাছে শুনে এ বিষয়ে ভাই-ভাতিজাকে বলতে গেলে তাদের ওপর বাপ-বেটা চড়াও হয়। এরপর তাদের মারধর করে থাকার ছাপড়া ঘর ভেঙে হাড়ি-পাতিল রাস্তায় ফেলে দেন। কোথাও যাওয়ার মতো জায়গা না থাকায় রাস্তাতেই আছেন তারা।

প্রতিবেশীরা যা দেন তা খেয়েই কোনো মতে জীবন বাঁচাচ্ছেন তারা।
ওই নারী এই প্রতিবেদককে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে বলেন, আপনারা আমারে একটা আশ্রয়ের জায়গা করে দিয়ে যান। প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে এখন কই যামু কি খামু। জোর করে জমি লিখে নেয়া এবং মেয়েকে নির্যাতন করার বিচারও চান তিনি।

মেয়েটি জানান, আলমগীর রাতে তাকে ঘুমাতে দেয় না। প্রতিরাতেই ঘরে ঢুকে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এ কথা যেন কাউকে না বলি এজন্য শাসায়, ভয় দেখায়। বিষয়টি তিনি প্রতিবেশীদেরও জানিয়েছেন।

এ সময় উপস্থিত কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, মেয়েটি প্রতিবন্ধী। সে কখনো মিথ্যা বলে না। ঘটনার বর্ণনা শুনে সত্যিই মনে হয়েছে। আশ্রয় দেয়ার নামে প্রতিবন্ধীকে এভাবে নির্যাতনের বিচার দাবি করেন তারা।

পিয়ার আলী, হাকিমুদ্দিন, কলো উদ্দিন, শাজাহান বিশ্বাস, উমেদ আলী, দিলরুবা আক্তারসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আশ্রয় দেয়ার নামে বিধবা ও তার মেয়ের কাছ থেকে কৌশলে জমি লিখে নিয়েছেন তারা। বিষয়টি এলাকাবাসীর অজানা ছিল। অসহায় বিধবা আর তার মেয়েটিকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। তারা রাস্তায় বসে আছেন। ঈদের দিনও তারা রাস্তায় কাটিয়েছেন। স্থানীয়দের দেয়া খাবার খেয়ে তারা বেঁচে আছেন।

দলিল ঘেটে দেখা যায়, নয়মন নেছার কাছ থেকে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা মূল্য দেখিয়ে তার ভাই মকর আলী ২০১৫ সালে জমিটি লিখে নেন। এরপর মকর আলী তার ছেলে আলমগীরকে লিখে দেন। একই বছর আলমগীর জমিটি লিখে দেন তার শিশু ছেলে মাহফুজুরের নামে।

manik-3

স্থানীয়রা বলেন, জমি নিয়ে ভবিষ্যৎতে যাতে কেউ দাবি তুলতে না পারেন এজন্যই একই বছরে পর পর তিনটি দলিল করেছেন চতুর মকর আলী। জমির মূল্য সাড়ে ১৩ লাখ দেখানো হলেও বাস্তবে জমির দাম আরও কম।

এ বিষয়ে কথা বলতে মকর আলীর বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। কোনো কথা বলতে রাজি হননি তার ছেলের বউ চম্পা বেগম। ছেলে আলমগীর হোসেন একটি মামলায় কারাগারে আছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জিয়া জানান, বিধবা ও তার প্রতিবন্ধী মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া এবং ধর্ষিত হওয়ার বিষয়টি জানার পর মকর আলীর সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে বসার জন্য বলা হলে মকর প্রথমে রাজি হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আর পাত্তা দেননি। ফলে বাধ্য হয়ে মেয়েটির মা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে তিনি শুনেছেন।

শিবালয় থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ সরকার অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বি. এম খোরশেদ/এমএএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।