৪৭ বছরেও সংশোধন হয়নি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বাবার নাম

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি ঝিনাইদহ
প্রকাশিত: ০৯:২৭ এএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ঝিনাইদহের শৈলকুপার দহকোলা গ্রামের ইব্রাহীম মিঞার ছেলে ইসমাইল হোসেন যোগ দেন মুক্তি বাহিনীতে। এলাকায় বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নেয়ার পর শৈলকুপার আবাইপুরে ঐতিহাসিক আবাইপুর যুদ্ধে পাক-হানাদারদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালে ১৪ অক্টোবর আবাইপুর গ্রামে পাক বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হন ইসমাইল হোসেনসহ ৪১ জন বীরযোদ্ধা, এদের মধ্যে কয়েকজন গ্রামবাসীও ছিল। সেখানে তাদের গণকবর দেয়া হয়। একটি স্মৃতি ফলকে শহীদ ইসমাইল হোসেনসহ ৪১ যোদ্ধার নাম লেখা হয়, যা আজো রয়েছে। এই দিনটি আবাইপুর ট্রাজেডী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। অথচ দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পরে এসে শহীদ ইসমাইল হোসেন কে আর খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই ।

সেই গণকবরের স্মৃতি ফলকসহ শৈলকুপা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সামনে সাম্প্রতি নির্মিত স্মৃতি ফলকে তার বাবার নাম সঠিকভাবে লেখা হয়নি। এমন কি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের গেজেটসহ স্থানীয় নানা কাগজপত্রেও এই শহীদের বাবার নামটি নানা ভ্রান্তিতে লেখা হয়েছে। আর তার পরিবার-স্বজনের জন্যেও কোন রাষ্ট্রীয় সম্মান বা সুযোগ-সুবিধা জোটেনি। ১৯৭১ সালের সম্মুখ সমরের এই নায়ক অকুতোভয় সৈনিক নানা বিস্মৃতির আড়ালে যেন হারিয়ে গেছে। স্বাধীনতার এই বীরসেনাদের স্মরণে লেখা গানটি যেন বড় নির্মম সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে শহীদ বীরযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের জীবনে ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা... হয়তবা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না/বড় বড় লোকেদের ভীড়ে জ্ঞানী আর গুণীদের আসরে/তোমাদের কথা কেউ কবে না।’

সরেজমিনে দেখা যায়, ঝিনাইদহের শৈলকুপার দহকোলা গ্রামের মৃত ইব্রাহীম মিঞার ৫ মেয়ে ও ৩ ছেলের মধ্যে শহীদ ইসমাইল হোসেন পলান ভাইদের মধ্যে ছিল ছোট। তার অপর দুই ভায়ের নাম হাসেন মিঞা ও হারুন অর রশিদ। ইসমাইল হোসেনের আপন এই ভাই ও মাও মারা গেছেন।

ইসমাইল হোসেনের বড় ভাই মৃত হাসেন মিঞার ছেলে আবুবকর সিদ্দিক জানান, তার চাচা ইসমাইল মিঞা পলান আবাইপুরযুদ্ধে শহীদ হন। বাড়িতে খবর এলে বড় ভাই হাসেন মিঞা আবাইপুরে যান তার ভাই ইসমাইলকে সনাক্ত করতে। তিনি তার ভাইকে সনাক্ত করে আবাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের গণ কবরে চিরনিদ্রায় শায়ীত করে আসেন। ছেলের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর ইসমাইল মিঞার মা ফুল নেছা ছেলের শোকে পাগল হয়ে স্বাধীনতার ৩-৪ বছর পর মারা যান।

Jhenidah-freedom1

তার অভিযোগ, সম্মুখযুদ্ধে শহীদ ইসমাইল হোসেনের বাবার নাম স্মৃতিফলকে সঠিকভাবে লেখা হয়নি। তার বাবার নাম ইব্রাহীম মিঞা হলেও সেখানে লেখা হয় মৃত ছানারউদ্দিন। আবার শহীদ এ মুক্তিযোদ্ধার বাংলাদেশ গেজেট ১৯১০ এ পিতার নাম খয়বর মিয়া লেখা হয়েছে। বড় ভাই হাসেন মিঞা অনেক চেষ্টার পরও গেজেট ও নামফলকে তার বাবার নামটি সংশোধন করাতে ব্যর্থ হন। আশ্বাসে অনেক টাকাও খরচ করেছেন তারা। শত চেষ্টার পর বড় ভাই হাসেন মিঞা ২০০৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে মারা যান। এরপর ভায়ের রাষ্ট্রীয় সম্মান ও সুযোগ সুবিধা পেতে চেষ্টা শুরু করেন অপর ভাই জেল পুলিশ হারুন অর রশিদ। অর্থকড়ি খরচ করে ব্যর্থ হয়ে তিনিও ২০১২ সালের জুন মাসে মারা যান।

এমন সব ঘটনার পর ভাতীজারা চাচার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য চেষ্টা করে চলেছেন। তারা নিজ খরচে বাড়ির সামনে একটি স্মৃতিফলক গড়েছেন। তবে পরিবারের অপর জীবিত সদস্যদের অভিযোগ গেজেটে এবং নামফলকে শহীদ এ মুক্তিযোদ্ধার বাবার নাম পরিবর্তন করে হয়তোবা অন্য কেউ মুক্তিযোদ্ধা কল্যান তহবিল থেকে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন।

প্রতিবেশী মুক্তিযোদ্ধা নূর ইসলাম জানান, ইসমাইল হোসেন মিঞা পলানের বাবার নাম মৃত ইব্রাহীম মিঞা। তিনি খয়বর মিয়া বা ছানারউদ্দিনের সন্তান না, গ্রামে এ নামে কেউ নেইও।

শৈলকুপা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার রহমত আলী মন্টু বলেন, ইসমাইল হোসেন আবাইপুরে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। তার নাম আবাইপুর ও শৈলকুপার স্মৃতিফলকে লেখা আছে। এ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বাবার নাম নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে সঠিকভাবে লিখা উচিত। এই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাসহ পরিবারটির প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান, সুযোগ-সুবিধা দেয়া উচিত।

আহমেদ নাসিম আনসারী/আরএ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :