আসামির মাথায় টুপি থাকলেই মামলায় খালাস!
অনিয়ম-দুর্নীতি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি বহির্ভুত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে কুড়িগ্রাম জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইবুনালের বিজ্ঞ জজ মো. মাহফুজার রহমানের আদালত বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে জেলা আইজীবী সমিতি। ১৫ দিনের মধ্যে বিতর্কিত এ বিচারককে অপসারণ করা না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য আদালত বর্জনের ঘোষণা দেয় নেতারা। বুধবার বিকেলে জেলা আইনজীবী সমিতির ভবনে এ সংবাদ সম্মেলন হয়।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এস এম আব্রাহম লিঙ্কন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এসময় সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফকরুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল কবীর দুলাল সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সংবাদ সম্মেলনের আগে জেলা আনজীবী সমিতির সাধারণ পরিষদের এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভার সর্ব সম্মতিক্রমে গৃহিত সিদ্ধান্তে বিশেষ ট্রাইবুনালের জজের অপসারণ দাবি করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইবুনালের জজ মো. মাহফুজার রহমান প্রচলিত আইনের কোনো তোয়াক্কা করেন না। বিদ্যমান নারী ও শিশু আইনের বিধান এবং ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ না করে ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও খাম খেয়ালি মতো মামলায় সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। নারী ধর্ষণের মতো মামলায় যেখানে ধর্ষণের চিকিৎসা সনদ আছে, আসামিকে অভিযুক্ত করে ভিকটিমের নারী ও শিশু আইনের ২২ ধারার জবানবন্দি, পুলিশ অভিযযোগপত্র দাখিল আছে এরকম মামলায় আসামি জামিন আবেদন করেছেন।
কিন্তু উক্ত বিচারক জামিন সংক্রান্ত কোনো আদেশ না দিয়ে মামলাটি খারিজ করে আসামিকে অব্যাহতি দিয়েছেন। এমনকি ডিএনএ টেস্টে আসামির বাবা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন তারও বিচার না করে তাকে খালাস দিয়েছেন। এরকম বহু গুরুতর প্রকৃতির মামলায় তিনি আসামির বিচার না করে মনগড়া খালাস দিয়েছেন যা বেআইনি।
বিজ্ঞ নারী আইনজীবীগণ তার আদালতে মোয়াক্কেলের পক্ষে আইনগত যুক্তি উপস্থাপন করতে গেলে শুধু নারী হওয়ার কারণে বাঁধাগ্রস্থ হন। তিনি নারী আইনজীবীদের বক্তব্য না শুনে তাদের বসিয়ে দেন। তিনি আইনজীবীর বক্তব্য না শুনে আদালতে প্রায়ই আসামিকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় ডেকে কোরআন হাদীস সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করে মামলার সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে অনেক মোয়াক্কেল সুবিধা পাওয়ার জন্য মাথায় টুপি দিয়ে এসে বিচারের নামে তার কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছেন। এরকম অনেক মামলায় তিনি আসামিকে শুধুমাত্র তওবা স্বীকার করে তাৎক্ষণিক মামলা থেকে খালাস প্রদান করেছেন। যা বিচারের নীতি বিরুদ্ধ।
শুধু তাই নয় এ বিচারকের মদদে পেশকার আবুল হাসেমের ঘুষ বাণিজ্য নারী ও শিশু আদালতে বিচারাধীন মামলার পক্ষগণকে অসহায় করে তুলেছে। এ পেশকারের পরামর্শ ছাড়া তিনি কোনো রায় দেন না। প্রকাশ্য আদালতে ঘোষণাকৃত সিদ্ধান্তও তিনি পেশকারের পরামর্শে বদল করেছেন। এরকম নজির রয়েছে। আসামি আদালতে উপস্থিত নেই কিন্তু তাকে আদালতে উপস্থিতি দেখিয়ে পেশকারের সহযোগিতায় আসামিকে জামিন দেয়ার গুরুত্বও অভিযোগ রয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরো বলা হয়, ইতোপূর্বে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মি. সৌমেন্দ্র কুমার মহোদয় কুড়িগ্রামে এলে তাকে নিয়ে মাননীয় বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক হয়। কিন্তু তিনি নিজ কার্যক্রমে অবিচল থাকেন। এরপর মাননীয় বিচারপতি মি. রেজাউল হক কুড়িগ্রাম জেলা জজশিপে আনুষ্ঠানিক পরির্দশনে এলে তিনি অনিয়মগুলো খতিয়ে দেখেন তাকে পরিবর্তিত হবার পরামর্শ দেন বলে আমরা জেনেছি। কিন্তু দু:খের বিষয় তিনি তাতে নিজের পরিবর্তন করেন নাই।
জেলা আনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফকরুল ইসলাম জানান, বুধবার থেকে অভিযুক্ত বিচারকের আদালত বর্জন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অনিয়ম ও দুর্নীতিবাজ এ বিচারককে প্রত্যাহার করতে মাননীয় প্রধান বিচারপতি ও আইন মন্ত্রনালয়ের সচিব মহোদয়কে আমরা অনুরোধ পত্র পাঠিয়েছি।
এছাড়া মাননীয় প্রধান বিচারপতি এস.কে সিনহা এবং মাননীয় সচিব আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় মহোদয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে যেন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতিকে দিয়ে বিচারক মাহফুজার রহমানের যোগদানের পর (প্রায় এক বছর) থেকে তার আদালতের নিষ্পত্তিকৃত সকল মামলার তদন্ত করা হয়। তারা একই সঙ্গে এ আদালতের দুর্নীতিবাজ পেশকার আবুল হাসেমকে অন্যত্র বদলি এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তোলেন।
নাজমুল হোসেন/এমজেড/এমআরআই