দ্বন্দ্বে আ.লীগ, সুযোগের অপেক্ষায় বিএনপি-জাপা

সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন
সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন হবিগঞ্জ
প্রকাশিত: ১২:৪২ পিএম, ১০ অক্টোবর ২০১৮

বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলে থাকা হবিগঞ্জের চার আসনে ইতোমধ্যেই লেগেছে নির্বাচনী হাওয়া। আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে মনোনয়নের দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিলেও বসে নেই বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যরা। তবে এবার আওয়ামী লীগের ব্যাপক অন্তর্কোন্দলের কারণে বেশ নাজেহাল অবস্থায় আছে দলটি। আর এ সুযোগটিই কাজে লাগাতে চাচ্ছে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। তবে ভোটাররা এখনও তাদের হিসাব-নিকাশের খাতাটা দূরেই রেখেছেন।

হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল)

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রবাসী অধ্যুষিত হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ইতোমধ্যে প্রচার প্রচারণা শুরু করেছেন। এবারের নির্বাচনে এ আসনে মোট ১২ জন প্রার্থী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বরাবরই আওয়ামী লীগের আসন হিসেবে পরিচিত এ আসনে গত কয়েক বছর ধরে নেতাকর্মীরা কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন। এ কোন্দল দিনে দিনে ব্যাপকতা পেয়েছে। দু’টি উপজেলাতেই কয়েকটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছেন নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে একটি ধারার নেতৃত্বে দিচ্ছেন বর্তমান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএমএর সভাপতি ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী। আরেক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর ছেলে দেওয়ান শাহনেওয়াজ গাজী মিলাদ।

এছাড়াও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী এবং নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরীর আলাদা দু’টি বলয় রয়েছে।

এ আসন থেকে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লড়াইয়ে নেমেছেন (হবিগঞ্জ ও সিলেট) সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী আলহাজ্ব দেওয়ান ফরিদ গাজীর ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান শাহ নেওয়াজ গাজী মিলাদ, নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আলমগীর চৌধুরী, কানাডা প্রবাসী মেজর (অব.) সুরঞ্জন দাশ, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া, প্রাক্তন সংসদ সদস্য ইছমত আহমদ চৌধুরীর মেয়ে আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ডা. নাজরা চৌধুরী ও যুবলীগের সদস্য আব্দুল মুকিত চৌধুরী।

এ আসনে বিএনপিতেও কোন্দলের শেষ নেই। এখানেও দুই প্রবাসী নেতার মাঝে চরম দ্বন্দ্ব চলছে। একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য যুক্তরাজ্য প্রবাসী আলহাজ্ব শেখ সুজাত মিয়া। আর অপরটির নেতৃত্বে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শিকাগো বিএনপির সভাপতি শাহ মোজাম্মেল হোসেন নান্টু। যদিও মোজাম্মেল হোসেন নান্টুর দেশে তেমন অবস্থান নেই। কিন্তু তারপরও দলের অনেক নেতাকর্মী মিলে এখানে তার অবস্থান রেখেছেন।

নবীগঞ্জে উপজেলা বিএনপি এখন দ্বি-খণ্ডিত। বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এ উপজেলায় ব্যতিক্রম কিছু ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র শিকাগো বিএনপির সভাপতি শাহ মোজাম্মেল নান্টু সমর্থিত ৪ জন বিএনপি নেতা ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পান। এনিয়ে দলীয় কোন্দল আরও চরম আকার ধারণ করে। এ দ্বি-খণ্ডের কারণেই ইউপি নির্বাচনে বিএনপির চরম ভরাডুবি হয়। এটিকেই একমাত্র কারণ হিসেবে মনে করছেন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

দলটি থেকে এবারের জাতীয় নির্বাচনেও এ দুই নেতাই মনোনয়ন দৌড় চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়া জাতীয় পার্টি থেকেও একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন। তবে মাঠে রয়েছেন একমাত্র বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক ছাত্রনেতা এমএ মুনিম চৌধুরী বাবু। আর লন্ডন প্রবাসী জাপা নেতা আব্দুল হামিদ চৌধুরী প্রবাসে থেকেও ব্যানার ফেস্টুনের মাধ্যমে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনিও আগামী সংসদ নির্বাচনে জাপার প্রার্থী হতে চান।

এছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক প্রচারণায় রয়েছেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী শেখ মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি নবীগঞ্জ-বাহুবলের আনাচে কানাচে ব্যানার ফেস্টুন সাটিয়ে বেশ আলোচনায় রয়েছেন।

হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ)

জেলার হাওরাঞ্চল বেষ্টিত হবিগঞ্জ-২ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অন্যান্য জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে দলটিতে তেমন বিরোধ না থাকলেও এবার সে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। মাঠে নেমেছেন ৬ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী। বিএনপিতেও বিরোধ কম নয়। প্রভাবশালী এক সৌদি প্রবাসী নেতা এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের নেতৃত্বে পৃথক দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন নেতাকর্মীরা। তবে বিগত দু’টি নির্বাচনে জাতীয় পার্টি এখানে ছাড় দিলেও এবার তারা ছাড় দিতে নারাজ।

একটি পৌরসভা ও ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ সংসদীয় আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ১০ হাজার। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত এ আসনটিতে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী ৭ বার জয়ী হয়েছেন। কখনোই এ আসনে তেমন কোনো বিরোধ ছিলনা। কিন্তু সম্প্রতি আসনটিতে নেতাকর্মীদের মাঝে বিভক্তি দেখা দেয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরেই মূলত এ বিরোধের সৃষ্টি হয়।

এ আসনে টানা দুইবারের সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল মজিদ খান। শুরু থেকেই মাঠ ছাড়েননি তিনি। সংসদ অধিবেশন ছাড়া বাকি সময় এলাকাতেই অবস্থান করেছেন। সভা সমাবেশ সবকিছুতেই তার সরব উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে বিভক্তি দেখা দেয়। তিনি ছাড়াও মাঠে নামেন আরও ৫ জন। তারা হচ্ছেন- উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসন মাস্টার, সাবেক এমপি মরহুম শরীফ উদ্দিন আহমেদের ছেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ময়েজ উদ্দিন শরীফ রুয়েল, জাতীয় সংসদের সাবেক ‘ল’ অফিসার ব্যারিস্টার এনামুল হক, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের শিশু ও পরিবার কল্যাণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহ্ফুজা বেগম সাঈদা ও হবিগঞ্জ জেলা কৃষক লীগ সভাপতি হুমায়ূন কবির রেজা।

এদিকে যদিও এটি কখনোই বিএনপির পাকাপোক্ত আসন ছিল না তবুও এখান থেকে দলটির প্রার্থী দুইবার জয়ী হয়েছেন।

দুর্বল এ আসনটিতে এবার শক্তিশালি প্রার্থী দিতে চায় বিএনপি। ভোটের রাজনীতিতে পিছিয়ে থাকলেও আগামী নির্বাচনে এ আসনটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে অন্যতম এ বড় দলটি। এখানে দলটির বিরোধ থাকলেও শেষ মুহূর্তে তারা একাট্টা হয়ে নামবেন বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীসহ অনেকেই।

মাঠের রাজনীতিতে ডা.সাখাওয়াত হাসান জীবন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পাওয়ার পর দলকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে তাকেই বিএনপি হেভি ওয়েট প্রার্থী হিসেবে মনে করছে। তবে মনোনয়ন চাইতে পারেন সৌদি আরব বিএনপির সভাপতি আহমেদ আলী মুকিব।

অপরদিকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়েছে জাতীয় পার্টি। দলটির জেলা সাধারণ সম্পাদক শংকর পালকে ঘিরে একাট্টা হয়েছেন নেতা-কর্মীরা।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন জাতীয় পার্টির জেলা সেক্রেটারি শংকর পাল। তার হাত ধরেই জাতীয় পার্টি আজ অনেকটা শক্তিশালী।

এ আসনটিতে প্রায় ৯৬ হাজার ভোট রয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। যা মোট ভোটের এক তৃতীয়াংশ। আর এ ভোটকে কাজে লাগাতে তাকেই একমাত্র প্রার্থী হিসেবে মনে করছে দলটি। এ ক্ষেত্রে অন্য কেউ এককভাবে এ সুযোগ নিতে পারবে না বলে মনে করছেন দলের নেতাকর্মীরা। তাছাড়া তিনি প্রায় ২ যুগ ধরে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গেও রয়েছে তার অত্যন্ত সুসম্পর্ক। দীর্ঘ সময় ধরে মাঠও চষে বেড়াচ্ছেন বীরদর্পে।

তবে এ আসনে দলটি থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রসমাজের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাদিকুর মিয়া তালুকদারও মনোনয়ন চাইতে পারেন।

হবিগঞ্জ-৩ (সদর ও লাখাই)

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধান দু’টি দলসহ সম্ভাব্য প্রার্থীরা সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারণাও। বিএনপিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা প্রচারণায় অনেক পিছিয়ে থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী অনেকটা এগিয়ে আছেন। রীতিমতো মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। তবে নির্বাচন নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মাঝে কিছুটা আলোচনা শুরু হলেও এখনও পুরোদমে নির্বাচনী আমেজ জমে ওঠেনি।

প্রতিটি সংসদ নির্বাচনেই হবিগঞ্জ সদর ও লাখাই উপজেলা নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জ-৩ আসনটির দিকেই নজর থাকে পুরো জেলাবাসীর। এক সময় জাতীয় পার্টির দুর্ভেদ্য ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনটি ২০০১ সালের নির্বাচনে তাদের হাতছাড়া হয়। টানা ৩ বার বিজয়ের পর জাপা প্রার্থী পরাজিত হন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত শাহ এএমএস কিবরিয়ার কাছে।

২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারী সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভা শেষে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন তিনি। এরপর উপ-নির্বাচনে জাপার ৩ বারের এমপি আবু লেইছ মো. মুবিন চৌধুরী বিএনপিতে যোগ দিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাকে পরাজিত করে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে দ্বিতীয়বারের মতো ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। বিগত সাড়ে ৯ বছরে তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। এ নির্বাচনী এলাকায় তিনি ছাড়া আওয়ামী লীগের আর কোনো শক্তিশালী প্রার্থী নেই বলেও জানা গেছে।

অপরদিকে বিএনপি এ আসনে আগামী নির্বাচনে শক্তিশালী প্রার্থী দেয়ার চিন্তাভাবনা করছে। এ ক্ষেত্রে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও হবিগঞ্জ পৌরসভার ৩ বারের নির্বাচিত মেয়র জি কে গউছের নামই আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। এ আসনে দলটি থেকে মাঠে রয়েছেন অপর সম্ভাব্য প্রার্থী দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ড্যাব সভাপতি ডা. আহমুদুর রহমান আবদাল।

উল্লেখ্য, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার সর্বশেষ চার্জশিটে জি কে গউছের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে তিনি প্রায় ২ বছর কারান্তরীণ ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি পৌরসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নজিরবিহীনভাবে বিজয়ী হন।

এদিকে এক সময়ের জাতীয় পার্টির এ ঘাঁটিতে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. আতিকুর রহমান আতিক। তিনি সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়কারীর দায়িত্ব নেন। একইসঙ্গে হবিগঞ্জ জেলা জাপার সভাপতির দায়িত্বও নেন তিনি। ১৯৯১ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়া দলটির হাল ধরেন তিনি শক্ত হাতে। দিনরাত কাজ করে দলকে সংগঠিত করেন। চাঙ্গা করেন দলের নেতাকর্মীদের। প্রতিনিয়তই তিনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তাকে পেয়ে ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীরাও চাঙ্গা হয়ে মাঠে নেমেছেন হারানো আসন পুনরুদ্ধারে।

২০১৪ সালের নির্বাচনে এ আসনটি থেকে জাপা প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য শিল্পপতি মো. আতিকুর রহমান আতিক। আগামী নির্বাচনেও এ আসন থেকে তিনি জাপা প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলের নেতাকর্মীরাও মনে করছেন তাকে মনোনয়ন দিলে তাদের হারানো এ আসনটি আবারও ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে।

হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট ও মাধবপুর)

হবিগঞ্জ-৪ আসনটি সিলেট বিভাগের প্রবেশদ্বার। চা বাগান বেষ্টিত চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। ১০টি নির্বাচনের মাঝে সাবেক সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী মরহুম অ্যাডভোকেট এনামুল হক মোস্তফা শহীদ এমপি নির্বাচিত হয়েছেন ৬ বার।

দীর্ঘ সময় এ আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে চা শ্রমিক ও সংখ্যালঘুদের বিশাল ভোট ব্যাংক। তাই এখানে নির্বাচনের চেয়ে কঠিন মনোনয়ন পাওয়ার লড়াই। প্রতিবারই এ আসন থেকে একাধিক প্রার্থী দৌড়ঝাঁপ করেন। এবারও মনোনয়ন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন দলের একাধিক নেতা। এছাড়া বিগত ৫ বছরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাহবুব আলীর সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকেরই দূরত্ব তৈরি হয়। উন্নয়নের নানা চাওয়া পাওয়ার হিসেব নিয়েও দলের মাঝে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে।

আর আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে কৌশল আঁটছে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। বিএনপি চায় আওয়ামী লীগের দুর্গ ভেঙে যেকোনো মূল্যে এ আসনটি তারা এবার দখলে নিতে।

দ্বন্দ্বের সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাতীয় পার্টিও মহাজোট থেকে আসনটি বাগিয়ে নিতে চাচ্ছে। কর্মীবান্ধব শক্তিশালী প্রার্থী দিয়ে ফিরে পেতে চায় তাদের হারানো রাজ্য।

এ আসনে এবার আওয়ামী লীগ থেকে এক ডজন মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে নেমেছেন। তারা হচ্ছেন- বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী, মাধবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা শাহ মো. মুসলিম, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন চৌধুরী অসীম, সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদের ছেলে নিজামুল হক রানা, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন, শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. আব্দুল হাইয়ের ছেলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা প্রকৌশলী আরিফুল হাই রাজীব, চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আকবর হোসেন জিতু, চুনারুঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান আবু তাহের, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মিছির আলী, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সৈয়দ মুনির, আইনজীবী দেওয়ান মারুফ সিদ্দিকী ও কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি দেওয়ান জয়নাল আবেদীন।

এদিকে আওয়ামী লীগের এ দ্বন্দ্বের সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বিএনপি জোট। এবার এ আসনটি তারা ছিনিয়ে নিতে চায়। সেজন্য এখনও পুরো ভরসা জেলা বিএনপির সভাপতি শিল্পপতি সৈয়দ মো. ফয়সলের উপরই। অবশ্য শেষমেশ যদি তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে নির্বাচন না করেন তবে দুই উপজেলাতেই অধিক জনপ্রিয় তার ভাই মাধবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. শাহজাহনকেই তুরুপের তাশ হিসেবে মাঠে নামাতে পারে দলটি।

যদিও এ আসন থেকে মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন আরও ৩ জন। তারা হচ্ছেন- সাবেক মহিলা এমপি শাম্মী আক্তার, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী আমিনুল ইসলাম ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী।

এদিকে আওয়ামী লীগের এবারের দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে কম মরিয়া নয় জাতীয় পার্টিও। প্রকাশ্যে তাদের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করায় জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য শিল্পপতি মো. আতিকুর রহমান আতিককে নিয়েই এগোতে চায় তারা। তাদের হারানো এ আসনটি এবার ফিরে পাওয়ার মোক্ষম সময় বলে তারা মনে করছেন। দীর্ঘদিন যোগ্য নেতৃত্ব না থাকায় তারা এ আসনটি নিয়ে তেমন লড়াই করতে পারেননি। এবার তাদের হাতে আবারও লড়াই করার মতো সুযোগ এসেছে। আর আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব তাদের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

অপরদিকে ২০ দলীয় জোটের শরীক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের এ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। তিনিও এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তিনি মাধবপুর উপজেলার বাসিন্দা।

এফএ/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :