প্রশাসনের সঙ্গেই লুকোচুরি খেলছেন জেলেরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ১২:৩৫ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০১৮

ঝালকাঠি জেলা ও উপজেলাগুলোতে মা ইলিশ ধরা ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ট্রলার যখন আসে তখন জেলেরা লুকিয়ে থাকেন। ট্রলার চলে গেলেই তারা ফের নদীতে নামেন। অভিযানের ট্রলার যখন নলছিটি উপজেলার মাটিভাঙা এলাকায় থাকে তখন মল্লিকপুর থেকে দপদপিয়া এলাকার জেলেরা মাছ ধরেন। আবার মল্লিকপুরের দিকে অভিযানের ট্রলার ছুটলে জাল নিয়ে নেমে পড়েন মাটিভাঙা এলাকার জেলেরা। ফলে কোনোক্রমেই মাছ ধরা থামছে না সুগন্ধা নদীতে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সুগন্ধা নদীর মাটিভাঙা আবাসন প্রকল্পের সামনে কয়েকজন যুবক দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন নদীর দিকে। নদীর মাঝে ২০ থেকে ৩০টি নৌকায় করে জাল ফেলেছেন জেলেরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন কয়েকজন মৌসুমি জেলেও। নিষিদ্ধ সময়ে জাল ফেলে ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরছেন তারা। ইলিশ ধরার কাজে তাদের সহযোগিতা করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

মাছ ধরে নদী তীরে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেউ জাল থেকে মাছ ছাড়িয়ে বস্তায় ভরছে, কেউ জাল টেনে কাজ এগিয়ে দিচ্ছে। আবার কেউ বস্তা ভরে পাশের ছোট খাল ব্যবহার করে পানের বরজের পাশে মাছগুলো নিরাপদে রেখে ফের নামছে।

একই অবস্থা চলছে সুগন্ধা নদীর অনুরাগ, আমিরাবাদ, খোজাখালী, কংসারদীঘি ও কুমারখালী এলাকায়। শুধু নলছিটির সুগন্ধা নয়, বিষখালী নদীতেও দিন-রাত সুযোগ পেলে ইলিশ শিকারে নামছে জেলে ও মৌসুমি জেলেরা। বিষখালী নদীর হদুয়া, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়ার শতাধিক স্পটে চলছে মা ইলিশ ধরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালী যুবকরা নদীর তীরে থেকে ইলিশ শিকারের পুরো কার্যক্রম তদারকি করে। তারা প্রত্যেকে মোবাইলে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের গতিবিধি জেলেদের কাছে পৌঁছে দেয়। যখনই ভ্রাম্যমাণ আদালত, মৎস্য বিভাগ বা পুলিশের টহল গাড়ি দেখতে পায়, তাৎক্ষণিক তা জেলেদের জানিয়ে দেয়। এসব খবর পেয়ে জেলেরা পাশের ছোট ছোট খালের ভেতরে ঢুকে নিরাপদে আত্মগোপন করে। কর্মকর্তারা চলে গেলে আবার জাল নিয়ে নদীতে নামে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দিনে ও রাতে জেলেরা নদী থেকে ইলিশ ধরছে। তবে ধরা মাছের দাম পাচ্ছে না খুব একটা। প্রতি কেজি ইলিশ মাত্র ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যেসব জেলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইলিশ পৌঁছে দিচ্ছে ক্রেতাদের বাড়িতে তারা ৪০০ টাকা কেজিতে বড় ইলিশ বিক্রি করে। আর যারা প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী তারা জেলেদের কাছ থেকে কম দামে কিনে বেশি টাকায় বিক্রি করে।

জানা গেছে, কিছু সময় জাল পেতে রাখলেই প্রচুর মা ইলিশ ধরা পড়ছে এখন। জেলেরা প্রতিদিন ইলিশ ধরে তা নির্বিঘ্নে বিক্রিও করছে।

নলছিটি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মিজানুর রহমান রুবেল বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। একা প্রশাসনের পক্ষে মাছ ধরা বন্ধ করা সম্ভব নয়। যে কারণে ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ স্থানীয় গণ্যমান্যদের নিয়ে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কোনো তৎপরতাই কাজে আসছে না।

এদিকে নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ায় বিগত বছরের তুলনায় এ বছর মৌসুমি ইলিশ শিকারির সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণে। নদীতে জাল ফেললেই বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ছে। তাই ঝুঁকি নিয়েই দিন-রাত প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাছ ধরছেন নদীপাড়ের বেশির ভাগ বাসিন্দা। যাদের নৌকা নেই তারাও রাতের আঁধারে আলো নিভিয়ে কলাগাছের ভেলায় করে নদীতে জাল ফেলছে। মাছ শিকারিদের বেশির ভাগই এলাকার প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। মাছ ধরে তুলনামূলক কম দামে গভীর রাতে উপজেলা সদরের বিভিন্ন বাসায় পৌঁছে দিচ্ছে একটি অসাধু চক্র।

রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা বেগম পারুল জানান, নদীতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে দুপুর ও রাতে খাবার খেতে যাওয়ার সময় জেলেরা নদীতে নামছে। আগামী দিনগুলোতে নদী ছেড়ে অভিযানকারীরা ওপরে আসবে না।

আতিকুর রহমান/এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।