মনিটরিং না থাকায় বেড়েছে চালের দাম

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০৭:০১ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০১৯

কুষ্টিয়ায় সব ধরনের চালের দাম হঠাৎ করে বেড়েছে। সাধারণত বাজারে নতুন ধান উঠলে চালের দাম হ্রাস পায়। কিন্তু এবার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। কেজিপ্রতি বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা।

দেশের বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগর। এখানকার চালকল মালিকদের দাবি, ধানের দাম বেশি হওয়ায় চালের দাম বেড়েছে। ধানের বাজার বেড়ে গেলে চালের বাজার আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

জানা গেছে, বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে চালের যে চাহিদা তার সিংহভাগ যায় কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকাম থেকে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এ মোকামে চালের দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে ছিল। নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকে চালের দাম বৃদ্ধি পায়। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোকামে নিত্যপণ্য চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব পড়ছে ভোক্তাপর্যায়ে।

খাজানগর মোকাম ঘুরে ও মিলমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের জুনের পর থেকে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চালের বাজার স্থিতিশীল ছিল। বিগত দুই বছরের তুলনায় চালের দাম সর্বনিম্ন ছিল এ সময়ে। বাইরের দেশ থেকে অব্যাহত চাল আসা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ধান ও চালের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় দামও কমে আসে। দেশি চালের কেনাবেচাও কমে যায় যেকোনো সময়ের তুলনায়। খাজানগরের সাড়ে তিন শতাধিক মিলে প্রচুর চালের মজুদ হয়ে যায়। এ সময় আটাশ, কাজললতা চাল প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকার নিচে। সরু চাল বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকার সামান্য বেশি।

খাজানগরের মিলমালিক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘২০১৮ সালে চালের বাজার স্বাভাবিক ছিল। নির্বাচনী বছর হওয়ায় সরকার চালের বাজার ব্যাপক নজরদারিতে রাখে। অনেক মিলে অভিযান চালানো হয়। বাইরে থেকে চাল আনা হয়। এসব কারণে বাজার বাড়েনি। বরং বেশি দামে ধান কিনে মিলমালিকরা কম দামে চাল বিক্রি করেছেন। এখন ধানের সংকট আছে। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর আড়তে চালের চাহিদা থাকায় মোকামে কিছুটা দাম বেড়েছে। তবে যে দাম বেড়েছে সেটা যৌক্তিক।’

southeast

‘চালের দাম বাড়ার খবরে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বড় বড় শহরের পাইকাররা গত দুই সপ্তাহে বিপুল পরিমাণ চাল খাজানগর মোকাম থেকে কিনে নিয়ে গেছে। খাজানগরের মিলগুলো এখন চালশূন্য বলা যায়।’

মিলমালিকরা জানান, নির্বাচনের পর হঠাৎ করে পাইকাররা চালের অর্ডার দিতে থাকে। তারা বিপুল পরিমাণ চাল কিনেছে গত দুই সপ্তাহে। এ সময়টাতে চালের টান পড়ায় খাজানগরসহ দেশের সব মোকামে চালের দাম বেড়েছে। এখন পাইকাররা বেশি দামে চাল বিক্রি করছে। তারা বেশি লাভ করে দুষছে মিলমালিকদের।

মিলগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় মিলমালিকরা এখন ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, বেশি ধান কিনে স্টক করে চাল তৈরির পর বাজারে ছাড়লে দাম পাওয়া যাবে। তবে সরকার যেকোনো সময় বাইরে থেকে কম দামে আমদানির সুযোগ দিলে তখন দেশি চাল বিক্রি কমে যেতে পারে। তখন লোকসানে পড়ার সম্ভাবনা আছে। এ কারণে অটো চালকল মালিকরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। তারা প্রতিদিন ধান সংগ্রহ করছেন। যে দামে ধান কিনছেন সেই অনুপাতে উৎপাদন করে বাজারে চাল ছাড়ছেন।’

এছাড়া গত বছর মিলগুলোতে অভিযানের পর থেকে মিলমালিকরা দৃশ্যমান গোডাউনগুলোতে ধান রাখছেন না। অনেক মিলমালিক অন্য জেলায় তাদের যেসব গোডাউন রয়েছে সেখানে ধান মজুদ করছেন।

খাজানগরের অটো রাইস মিলগুলোতে গতকাল রোববার কাজললতা চাল বিক্রি হয়েছে ৪৫টাকা কেজি দরে। সরু চাল বিক্রি হয়েছে ৪৯ টাকা কেজি। নভেম্বর মাসে কাজললতা বিক্রি হয়েছে ৩৯ টাকা থেকে ৪০ টাকায়। মিনিকেট বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৪৪ থেকে ৪৭ টাকা পর্যন্ত। তখন ধানের দাম ছিল হাজারের নিচে। এখন সরু ধান বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি এক হাজার ২০০ টাকায়। আর কাজললতা বিক্রি হচ্ছে হাজারের নিচে। স্বর্ণা মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৩২ টাকায়। ধানের দাম পড়ছে ৭০০ টাকার মতো।

southeast

কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, ‘গত বছর দেশি চালের বাজার ছিল যেকোনো সময়ের তুলনায় কম। সাধারণ মানুষ অনেক সস্তায় চাল ক্রয় করতে পেরেছে। সে সময় সরকারও চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নানা পদক্ষেপ নেয়। এছাড়া গত বছর আবহাওয়া ভালো থাকায় দেশি ধানের উৎপাদন হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ। খুচরা পর্যায়ে চাষিরা ধানের দাম পাননি। পানির দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে তাদের। এখন ধানের দাম বাড়ায় চালের দাম বেড়েছে।’

‘তবে মন্ত্রীর সঙ্গে মিলমালিকদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে চালের বাজার যাতে সামনে আর না বাড়ে সে ব্যাপারে মিলমালিকদের পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। ধানের বাজার যদি না বাড়ে চালের দামও সামনে আর বাড়বে না। বরং দু-এক টাকা কমতে পারে। তবে এখন ধানের দাম বাড়লেও তাতে চাষিদের কোন লাভ হচ্ছে না। লাভ হচ্ছে ফড়িয়াদের।’

এদিকে খাজানগর মোকামে চালের দাম বাড়ালেও মনিটরিং টিমকে এখন পর্যন্ত কোনো মিলে অভিযান চালাতে দেখা যায়নি। মনিটরিং জোরদার হলে বাজার স্থিতিশীল থাকার পাশপাশি দামও কমে আসবে বলে মনে করেন সচেতন মহল।

আল-মামুন সাগর/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :