সিলেটে এইডস রোগীদের বাসা ভাড়া দিচ্ছে না বাড়ির মালিক

ছামির মাহমুদ
ছামির মাহমুদ ছামির মাহমুদ সিলেট
প্রকাশিত: ০২:০৬ পিএম, ০৬ জুন ২০১৯

এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগ নিয়ে সচেতনতার অভাবের কারণেই প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে দিন দিন বাড়ছে এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। ৩ মাসের আগে কোনো পরীক্ষায়ই শরীরের এইচআইভি ভাইরাস ধরা পড়বে না। এ অবস্থায় না জেনে অনেকে ছড়াচ্ছেন মরণব্যাধি এ রোগ। আবার ব্লাড ব্যাংকের অসাধানতায় ও পর্যাপ্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা না করে রক্ত সংগ্রহেও বাড়ছে এইডস রোগীর সংখ্যা এমন মত বিশেষজ্ঞদের।

যৌনমিলনের মাধ্যমেই নারী, পুরুষ, সমকামীদের মধ্যে এইচআইভি ছড়িয়ে পড়ার হার বেশি বলে জানিয়েছেন এ রোগ নিয়ে কাজ করা কয়েকটি এনজিও সংস্থার কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে এইচআইভি পজিটিভ আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গত একবছরে সিলেটে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৭১ জন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য মতে, সিলেটের ৪টি জেলায় ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৯৩০ জন এইচআইভি এইডস পজিটিভ রোগীর সংখ্যা রয়েছেন। এরমধ্যে মারা গেছেন ৩৭৯ জন। পুরুষ ২৯৩ জন, নারী ৬৮ জন, শিশু ১৭ জন ও হিজড়া একজন। আর জীবিত আছেন ৫৫১ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২৬৯ জন, নারী ২৩২ জন, শিশু ৪৮ জন ও হিজড়া ২ জন।

আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অর্ধেকই প্রবাসী কিংবা প্রবাসী পরিবারের সদস্য। এখন পর্যন্ত সিলেটে এইডসে আক্রান্ত রোগী বেঁচে আছেন ৫৫১ জন। তাদের মধ্যে নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে এআরবি ওষুধ সেবন করছেন ৪৯০ জন। বাকিরাও কাউন্সিলিং সেবার ভেতরে রয়েছেন বলে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। তবে সিলেটে এ হিসাবের বাইরেও এইডস রোগী আছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

সূত্র আরও জানায়, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এইডস, এসটিডি প্রোগ্রাম এবং ইউনিসেফের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় পিএমটিসির মাধ্যমে এ সেবাটি দেয়া হচ্ছে। আর সব রোগীর সেবা প্রদান করছে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

হাসপাতালের এইচআইভি এইডস সেল সূত্রে জানা গেছে, এইচআইভি এইডস পজিটিভ রোগীরা সেবার আওতায় আসলেই ভালো থাকা সম্ভব। গত কয়েক বছরে এইচআইভি এইডস পজিটিভ ৪৮ জন নারী ৫০ জন বাচ্চা প্রসব করেছেন এবং বাচ্চারাও সুস্থ আছেন। এমনকি যারা এআরবি ওষুধ খাচ্ছেন তারা সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন।

সূত্র জানায়, সিলেটে সংস্থাগুলোর দেয়া পরিসংখ্যানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী রয়েছে। এদের বৃহৎ একটি অংশ চিকিৎসার বাইরে থাকায় সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতেও সিলেটে সবচেয়ে বেশি এইডস রোগী রয়েছেন।

পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সিলেটে এইচআইভি পজিটিভে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। গত এক যুগের তুলনায় গত ৫ বছরে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে দিগুণ। এক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের নিয়মিত চেকআপ নিয়মিত করা গেলে সিলেটে এইচআইভি এইডসের ঝুঁকি কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা।

জানা গেছে, এইচআইভি এইডস আক্রান্ত রোগীদের একটি অংশ নিয়মিত চিকিৎসা নিলেও লোক লজ্জার ভয়ে অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের তথ্য মতে, এইডস রোগীর বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্য ফেরত। তার মধ্যে সৌদি আরব, কুয়েত ও দুবাই ফেরত। দক্ষিণ আফ্রিকা ও আশপাশের দেশ ফেরত কিছু রোগীও রয়েছে। এছাড়াও, সিলেটে ড্রাগে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ এবং অবাধ যৌন মিলনের কারণেও এ রোগ ছড়াচ্ছে। সিলেটে যৌনপল্লী না থাকলেও বিচ্ছিন্নভাবে এ কাজে লিপ্ত থাকা যৌন কর্মীরা জানে না কীভাবে এইচআইভি সংক্রমিত হয়।

এছাড়া সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সিলেট বিভাগের জৈন্তিয়া, বড়লেখা, জুড়ী, কুলউড়া, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ উপজেলার চা বাগানগুলোতে চা শ্রমিকদের মধ্যে এইচআইভি জীবানু সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এসব উপজেলার দিয়ে প্রতিবেশী ভারত থেকে বাংলাদেশে বৈধ ও অবৈধ পথে কয়েক হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছে। সিলেট বিভাগে ছোট বড় ১৩৫টি চা বাগান রয়েছে। বাগানগুলোতে কর্মরত আছে লক্ষাধিক শ্রমিক। অশিক্ষা, অজ্ঞতা, অসচেতনতা, বিনোদনহীনতা, মাদকাসক্তি প্রভৃতি কারণে এইচআইভি ঝুঁকিতে রয়েছে চা বাগানের শ্রমিকরা।

জানা যায়, সিলেটে অনেক সচেতন মানুষ আছেন, যারা এইডস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। কিন্তু তারপরও তারা এইডস রোগীদের বাসা ভাড়া দিতে চান না। আবার শহরের বেসরকারি অনেক হাসপাতাল আছে যারা এইডস রোগীদের ভর্তি করতে অনীহা প্রকাশ করেন। সামাজিক এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক রোগী নিজের সমস্যা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখে দেয়।

সিলেটে এইডস নিয়ে কাজ করছে বন্ধু, এফটিএভি, মেরিস্টোপ, সিলেট যুব একাডেমী, সিমান্তিক, ব্র্যাকসহ অসংখ্য এনজিও সংস্থা। এরমধ্যে সরাসরি এইডস রোগীদের নিয়ে প্রায় দেড় যুগ ধরে কাজ করছে আশার আলো সোসাইটি নামের একটি এনজিও সংস্থা। সারা দেশে তাদের এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এফটিএভির প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর তোফায়েল আহমদ জানান, তাদের সংস্থাটি শুধু এইচআইভি এইডস বিষয়ে সচেতনতামূলক পরামর্শ দেন।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওই প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. মোতাহার হোসাইন জানান, তাদের এ সেবার আওতায় ওমেক হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এইচআইভি এইডস সনাক্ত করা হচ্ছে। পজিটিভ রোগীদের সেবার আওতায় এনে নিয়মিত চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।

এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিএমটিসিটি প্রোগ্রামের ফোকাল পার্সন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আবু নঈম মোহাম্মদ বলেন, কেউ যদি মনে করেন তিনি এইডসে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে তিনি আমাদের কাছে এসে বিনামূল্যে পরীক্ষা করে চিকিৎসা নিতে পারেন। তাদের জন্য কাউন্সিলিংয়েরও ব্যবস্থাও রয়েছে আমাদের।

এমএএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]