এবার মায়ের মুখটি স্পষ্ট দেখবে শিশু আসিফ

মাহাবুর আলম সোহাগ
মাহাবুর আলম সোহাগ মাহাবুর আলম সোহাগ , সহকারী বার্তা সম্পাদক (কান্ট্রি ইনচার্জ)
প্রকাশিত: ০৯:৫১ পিএম, ২৫ জুন ২০১৯

ঝিনাইদহ থেকে গত শনিবার রাত ৯টায় রয়েল পরিবহনের একটি গাড়িতে পরদিন ভোর সাড়ে ৫টায় রাজধানীর গাবতলীতে এসে পৌঁছান রত্না বেগম তার ৬ মাস বয়সী সন্তান আসিফ ও মা মাজেদা খাতুন (আসিফের নানি)।

দিনমজুর স্বামী সময়মতো সন্তানের চিকিৎসা করাতে না পেরে অভিমান করে স্বামীকে না জানিয়েই ঢাকায় চলে আসেন তিনি।

এরপর গাবতলী থেকে তারা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসেন শ্যামলী-শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। ততক্ষণেও হাসপাতালের কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর হাসপাতালে প্রবেশ করে তারা পূর্বের কাগজপত্র নিয়ে জরুরি বিভাগে গিয়ে ভর্তির কাজ সারেন।

ভর্তির পরদিন রত্না বেগমকে জানিয়ে দেয়া হয় সোমবার অপারেশন হবে আসিফের। তবে একটি চোখের। কিন্তু ওই রাতেই ঠান্ডা লেগে যাওয়ায় পরদিন আর অপারেশন হয়নি।

অবশেষে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় আসিফের ডান চোখের অপারেশন হয়েছে। বর্তমানে সে সুস্থ। আসিফকে নিয়ে তার মা জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চতুর্থ তলার ৭ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন।

রত্না বেগম জানান, সংসারে তাদের অভাবের শেষ নেই। সামান্য বৃষ্টিতে ঘরের সব কিছু ভিজে যায়। জন্মের ছয় মাস হলো কিন্তু সন্তান চোখে ঝাঁপসা দেখে। এ বিষয়গুলো বার বার স্বামী অলিয়ার বলেও কোনো সমাধান পাচ্ছিলেন না তিনি। তাই স্বামীর ওপর অভিমান করে কয়েক দিন আগে বাবার বাড়িতে চলে যান তিনি। ওই সময় স্বামী কাজের জন্য কয়েক দিন ধরে বাড়ির বাইরে অবস্থান করছিলেন।

ASif

তিনি বলেন, বাবার বাড়িতে যাওয়ার পর আসিফের নানা আমাকে ৫ হাজার টাকা দেয়। সেই টাকা নিয়েই শনিবার ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হই। হাসপাতালে আসার পর হাতে টাকা ছিল তিন হাজার। এর মধ্যে অপারেশনের আগের দিন সাড়ে ৪ হাজার টাকার ওষুধ কিনেছি। ওষুধের দোকানে কিছু বাকি আছে। হাসপাতালের সামনে এক হোটেলে চারদিন ধরে বাকি খেয়েছি।

রত্না বলেন, আল্লাহর কাছে হাজারও শুকরিয়া ছেলের অপারেশন করাতে পেরেছি। সরকারিভাবে ফ্রি অপারেশন হয়েছে। নার্সরা বলেছেন, আগামীকাল হয়তো আমাদের রিলিজ দিয়ে দেবে। এটা শোনার পর চিন্তায় পড়ে গেছি, কারণ বাকি টাকা দেব কোথায় থেকে এ ভেবে?

আসিফের নানি মাজেদা খাতুন জানান, এক কাপড়েই মা-মেয়ে ঢাকা চলে এসেছেন। আরও টাকার প্রয়োজন সেটা তার নানাকে জানানো হয়েছে। তিনি ব্যবস্থা করে ঢাকায় আসবেন বলে জানিয়েছেন তাদের।

আসিফকে নিয়ে গতকাল সোমবার ২৫ হাজার টাকা হলেই পৃথিবী দেখবে শিশু আসিফ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার খবর তখনও অজানা তাদের। এ সংবাদ প্রকাশের পর ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকেই আসিফের চিকিৎসায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ইতোমধ্যে তার বাবার নম্বরে প্রায় ২০ হাজার টাকা বিকাশ করেছেন দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই। খবরটি জানানোর পর অনেকটাই চমকে যান রত্না বেগম ও তার মা। তাৎক্ষণিকভাবে রত্না বেগম এ প্রতিবেদকের সামনেই স্বামীকে কল করেন এবং বিস্তারিত আলোচনা করেন।

অবশেষে রত্না বেগম ও তার মা মাজেদা খাতুন এ প্রতিবেদককে ধন্যবাদ জানান, তাদের চিন্তামুক্ত করার জন্য।

বাম চোখের কবে অপারেশন হবে জানতে চাইলে রত্না বেগম বলেন, এখনও জানানো হয়নি ওই চোখের অপারেশন কবে হবে বা আমাদের কবে আসতে হবে। তবে তিনি এও বলেন যে হয়তো রিলিজ দেয়ার সময় বলে দিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় আসিফের বাবা অলিয়ার রহমানের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে জানান, গতকাল এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি জানতেন না তার স্ত্রী সন্তান ঢাকায় অবস্থান করছেন। বিষয়টি বার বার তিনি এ প্রতিবেদককে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করেন।

তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এক নারী ১৫ হাজার টাকা বিকাশ করার পর তাকে ফোনে জানিয়েছেন। এছাড়াও অনেকে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা তার নম্বরে বিকাশ করেছেন। সর্বমোট কত টাকা পেয়েছেন সেটা তিনি এখনও হিসাব করেননি। তিনি জানালেন, রাতেই ঢাকায় স্ত্রীকে টাকা বিকাশ করে দেবেন ওষুধ ও খাবারের বাকি টাকা পরিশোধ করে এলাকায় চলে আসার জন্য। বাকি টাকা দিয়ে তিনি ঘর মেরামত করবেন বলে জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের সিনিয়র সাংবাদিক আসিফ কাজল বলেন, সকালে অলিয়ারকে ফোনে না পেয়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখি কেউ নেই। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানতে পারি তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে কয়েকদিন আগে বাবার বাড়ি চলে গেছে। তাদের কাছ থেকেই অলিয়ারের স্ত্রীর নম্বর নিয়ে কথা বলে জানতে পারি তারা ঢাকায়।

ASif

তিনি বলেন, তাদের মাঝে কিছু ভুল বোঝাবুঝির কারণে কিছু তথ্য বিভ্রাট ঘটেছে। তবে তিনি আসিফের চোখের অপারেশন হওয়ায় শুকরিয়া আদায় করেছেন।

প্রসঙ্গত, চোখে ছানি নিয়েই জন্মগ্রহণ করে আসিফ। প্রথম তিন মাসে পরিবারের কেউই বিষয়টি বুঝতে না পারলেও কিছু লক্ষণ দেখে বুঝতে পারেন ডাক্তার। তিন মাস বয়সে জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল আসিফ। ওই সময় ঝিনাইদহ শহরের এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে তিনি আসিফকে একজন চোখের ডাক্তার দেখানোর কথা বলেন।

এরপর চলতি বছরের ২০ মে আসিফকে ঝিনাইদহ চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার ডা. আব্দুর রউফ আসিফের চোখে জন্মগত ছানি পড়ার কথা জানান। তখন তিনি ঢাকায় রেফার্ড করেন।

ঝিনাইদহ চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আব্দুর রউফ জানান, বেসরকারি কোনো ক্লিনিকে জন্মগত ছানি অপারেশন করতে ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ সরকারি হাসপাতালে এ চিকিৎসা ফ্রি।

তিনি বলেন, ঝিনাইদহ চক্ষু হাসপাতালে শিশুদের অপারেশন করার মতো কোনো প্রযুক্তি না থাকায় আসিফকে ঝিনাইদহ থেকে রাজধানীর শ্যামলী শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসা নিলেই সুস্থ হয়ে যাবে সে।

এর আগে গত ২৩ মে আসিফকে নিয়ে তার বাবা অলিয়ার ও মা রত্না রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসেন। সেখানে কয়েক দিন ভর্তি থেকে আসিফের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এতে তাদের ৮ হাজার টাকা খরচ হয়। গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে ধার করে আনা সেই টাকা আজও পরিশোধ করতে পারেননি তিনি।

শিশু আসিফ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের অলিয়ার রহমান ও রত্মা খাতুনের একমাত্র ছেলে। তারা এখন ঝিনাইদহ শহরের পাবহাটী মাঠপাড়ার একটি বস্তিতে থাকেন।

এমএএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :