ভেসে গেছে মাছ, পথে বসেছেন চাষিরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ১২:০৫ পিএম, ২১ আগস্ট ২০১৯

মাছ চাষে স্বাবলম্বী হতে গিয়ে এ বছর পথে বসেছেন জেলার হাজার হাজার জেলে। বন্যার পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় মাত্র ১ ঘণ্টায় ভেসে গেছে তাদের সব স্বপ্ন। এখন চরম দুর্দিন চলছে তাদের।

জানা গেছে, সংসারে আর্থিক টানাপোড়েনের মাঝেও মাছের প্রতি ছিল চাষিদের আলদা ভালোবাসা। তাই নিজেরা না খেলেও প্রতিদিন মাছের খাওয়া নিশ্চিত করতেন। বন্যার পানিতে খামার ভেসে যাওয়ায় এ বছর এই তাদের দুর্দিন চলছে। এ অবস্থায় কেউ কেউ গরু-ছাগল বিক্রি করে আবারও মাছ চাষ করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। কেউবা ছেলে-মেয়ের লেখাপাড়ার খরচ ও সংসার চালাতে জমি বিক্রির কথা ভাবছেন।

গাইবান্ধায় এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাঘাটা উপজেলায়। সেখানে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে গাইবান্ধায় মৎস্য খাতে এ বছর সর্বমোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি টাকা ৭৯ লাখ টাকা।

সাঘাটার বোনারপাড়া ইউনিয়নের জাহান প্রধান বিদেশ থেকে ছেলের পাঠানো টাকা জমিয়ে বাড়ির পার্শবর্তী পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন। মাছের প্রতি তার ভালোবাসার শেষ নেই। সারাদিন পুকুর পাড়েই থাকেন। ১০ লাখ টাকা খরচ করে মাছ চাষে সংসারে আলো জ্বলাতে গিয়ে নিভে গেছে তার জীবনের আলো। হঠাৎ বন্যায় পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় শোকে পাথর হয়ে মারা যান তিনি।

কয়েক লাখ টাকার নেট জাল দিয়ে সাঘাটার বুরুঙ্গী বিলের একাংশ ঘিরে মাছ চাষ করেন তারা মিয়া। বন্যায় সেই মাছ ভেসে যাওয়ায় শোকে শাহ জাহানের মতো তিনিও মারা যান। এভাবে এ জেলায় অনেক মাছ চাষি বন্যার কারণে নিঃস্ব হয়েছেন।

একই ইউনিয়নের শিমুলতাইড় গ্রামের সাজু মিয়া জানান, এ বছর বন্যায় তার তেলিয়ান বিলের মাছের প্রজেক্টে ২০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। বড় আকারের মাছ ছাড়াও ২ থেকে ৩ হাজার মণ পোনা মাছ ভেসে গেছে। এতে মূলধন হারিয়ে এখন নিঃস্ব জীবন কাটাচ্ছেন। আগামী ১০ বছরেও এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। কিন্তু এখনও মেলেনি সরকারি কোনো সহযোগিতা।

fish-cultivation

সাঘাটার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের যাদুরতাইর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক জানান, মাছ চাষ করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। ৩ বছর আগে ১০ একর জমিতে রুই, কাতলা, স্বরপুটি, মৃগেলসহ বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ শুরু করেন। ৩ বছর ধরে সেই মাছকে নানা খাবার খাইয়েছেন। আশা ছিল প্রতিটির ওজন ৫ থেকে ১০ কেজি হলে বিক্রি করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়নি। বাঁধ ভেঙে ১ ঘণ্টার মধ্যেই পুকুরের সব মাছ ভেসে যায়। নেট জাল দিয়ে অনেক চেষ্টা করেও প্রবল স্রোতের কারণে মাছ রক্ষা করা যায়নি। তার ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। এরপরও হাল ছড়েননি তিনি। গরু বিক্রয় করে আবার মাছ চাষ করে ঘুড়ে দাঁড়াতে বগুড়ার সুখানপুর থেকে মাছের পোনা সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু সেই পোনা মাছ বড় করে বিক্রির জন্য যে টাকা লাগবে তা জোগাড় করতে হিমসিম খাচ্ছেন এই মাছ চাষি।

একই গ্রামের রোস্তম আলী মন্ডল জানান, ৫ একর জমিতে মাছ চাষ করে সংসার ভালই চলছিল। কিন্তু এ বছর বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছে তাতে জমি বিক্রি করে সংসার চালাতে হবে। অন্য কোন পথ নেই। একই চিত্র ওই গ্রামের মজিবর রহমানেরও।

এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল দাইয়ান জানান, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি নিরসনে পরবর্তী পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় জেলায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মৎস্য সংকট নিরসনে চাষিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে।

গাইবান্ধা জেলা মৎস্য অফিসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় জেলার ৭টি উপজেলায় ৭ হাজার ৫০টি পুকুর ও মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ২৯০টি পুকুর এবং ৭৬০টি মৎস্য খামার রয়েছে। বন্যায় মৎস্য খামারের ২ হাজার ৬০ মে. টন মাছ এবং ১ কোটি ১১ লাখ পোনা ভেসে গেছে। এছাড়া অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মৎস্য খাতে সর্বমোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি টাকা ৭৯ লাখ টাকা।

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ বছর বন্যার পানিতে ডুবে ৯ জন মারা গেছেন এবং ৩৫ হাজার ৯১৩টি পরিবারের ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯০ জন সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১ লাখ ১২ হাজার ৮৫২টি পরিবারের ৪ লাখ ৬২ হাজার ৯০৭ জন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

জাহিদ খন্দকার/এমএমজেড/জেআইএম