২৫ টাকা বেতনের হোটেল বয় এখন মালিক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ১২:৩০ পিএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

অভাবের সংসারে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা। তাই ২২ বছর আগে বাবা-মায়ের ওপর অভিমান করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নওগাঁয় চলে আসেন আলী আজগর হোসেন। এরপর শহরের বালুডাঙা বাসস্ট্যান্ডে ২৫ টাকা বেতনে হোটেলে কাজ শুরু করেন। এখন সেই হোটেল বয় হাজী নজিপুর হোটেল অ্যান্ড বিরিয়ানি হাউজের মালিক। পরিশ্রম ও সাধনা তাকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

আলী আজগর হোসেনের বাড়ি নাটোরের সিংড়া উপজেলার মহেষচন্দ্রপুর গ্রামে। তবে এখন তিনি জমি কিনে নওগাঁ শহরের চকরামচন্দ্র মহল্লায় সপরিবারে বসবাস করছেন।

Naogaon-Eat

শহরের বালুডাঙা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আদালতের প্রধান ফটকের বিপরীতে রাস্তার পশ্চিম পাশে হাজী নজিপুর হোটেল অ্যান্ড বিরিয়ানি হাউজ। যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। তবে শুক্রবার ও শনিবার আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অন্যান্য দিনের তুলনায় স্বল্প পরিমাণ রান্না করা হয়। হোটেল মালিক সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার দুপুরে ১০০-১৫০ জন গরিব মানুষ বিশেষ করে ভিক্ষুকদের ফ্রিতে খাওয়ান। যেখানে খাবার মেনুতে থাকে- মাছ, মাংস, ডিম, সবজি ও ডাল। হোটেলের সামনে চেয়ার-টেবিলে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথমে দেখলে মনে হতে পারে সেখানে কোনো ছোটখাটো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য দিনে ২০-২৫ জন ফ্রি খেয়ে থাকেন। তবে বৃহস্পতিবারের বিষয়টি সবার জানা থাকায় সেদিন বেশি মানুষ হয়ে থাকে। গত এক যুগ ধরে এভাবে গরিব-অসহায়দের একবেলা খাবার দিয়ে আসছেন আলী আজগর হোসেন।

হোটেল মালিক আলী আজগর হোসেন বলেন, অভাবের মধ্য দিয়েও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছি। ১৯৯৭ সালে বাবা-মায়ের ওপর অভিমান করে বউ ও ছেলে-মেয়েদের নিয়ে নওগাঁয় চলে আসি। এখানে এসে হোটেলে দিনে ২৫ টাকা মজুরিতে কাজ শুরু করি। বেশ কয়েক বছর হোটেল কাজ করলাম। হঠাৎ একদিন হোটেল মালিক তার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে বাড়িতে চলে গেলেন।

Naogaon-Eat

পরে হোটেল মালিককে বুঝিয়ে নিয়ে আসি এবং তার দোকান চালানোর জন্য অনুমতি নিই। মালিক বললেন- যদি দোকান চালাতে পারো তাহলে চালাও। এতে আমার কোনো আপত্তি নাই। এরপর দুই কেজি, পাঁচ কেজি গরুর মাংস রান্না করে বিক্রি শুরু করি। এখন অনেক বেচাকেনা হয়। দোকানে ৩৫ জন কর্মচারী কাজ করে। এরই মধ্যে হজ করেছি। আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। শহরের মাথা গোঁজার মতো একটু জায়গা হয়েছে। দুই মেয়ে ও এক ছেলে পড়াশুনা করছে।

তিনি আরও বলেন, এক সময় অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করেছি। ডান পা একটু ছোট হওয়ায় ঠিকমতো ভারি কাজ করতে পারতাম না। নিয়ত করেছিলাম কখনো যদি অভাব থেকে মুক্ত হতে পারি তাহলে সামর্থ্য অনুযায়ী গরিবদের খাওয়াবো। আমার সেই স্বপ্ন আল্লাহ পূরণ করেছেন। সাধ্যের মধ্যে গত এক যুগ ধরে গরীব মানুষদের একবেলা খাইয়ে থাকি। কারণ অভাব কী আমি বুঝি। এছাড়া কেউ যদি আমার কাছে খাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করে তাকে ফেরত দিই না। সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বেশি মানুষ খেতে পারেন।

হোটেলে ফ্রিতে খেতে আসা বয়োজ্যেষ্ঠ নুর জাহান ও জাহিদুল বলেন, আমরা গরিব মানুষ। ভিক্ষা করে ভালোমন্দ খেতে পারি না। গত ৩থেকে ৪ বছর এ হোটেলে নিয়মিত খেতে আসি। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে বৃহস্পতিবার দুপুরে এসে কখনো গোস্ত, কখনো মাছ দিয়ে পেট পুরে খাবার খাই। আল্লাহ যেন হোটেলে মালিকের মঙ্গল করেন।

আব্বাস আলী/আরএআর/এমএস