অভিনব কৌশলে সংগঠিত হচ্ছে জামায়াত-শিবির

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি ঈশ্বরদী (পাবনা)
প্রকাশিত: ০২:৪৪ পিএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতা ও মানবতাবিরোধী হিসেবে দণ্ড পেয়ে ফাঁসিতে মৃত্যুবরণকারী মতিউর রহমান নিজামী ও মাওলানা আব্দুস সোবহানের বাড়ি পাবনা জেলায়। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন মতিউর রহমান নিজামী মন্ত্রী ছিলেন এবং পুরো পাবনা জেলায় দলকে সংগঠিত করেছিলেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয় এবং জামায়াতের বড় বড় নেতা স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত হলে দলীয় কাজে সমস্যা দেখা দেয়। অনেক দিন পর আবার বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী দল ও ’৭১-এ যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী পাবনার ঈশ্বরদীতে গোপনে নানা কৌশলে সংগঠিত হচ্ছে। সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয়ের জন্য বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে কাজ করছেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা।

জানা গেছে, জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে ভোল পাল্টে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত করছেন। নিবন্ধন বাতিল হলেও তাদের অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়নি। ফলে এ অঞ্চলে জামায়াত-শিবিরের আর্থিক সরবরাহ অব্যাহত আছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিজেদের সংগঠিত করতে বিকল্প পন্থা হিসেবে তাদের পরিচালিত আর্থিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাসাবাড়িতে বৈঠক করে যাচ্ছে জামায়াত-শিবির। গত কয়েক বছর তারা প্রকাশ্যে মিছিল-সমাবেশ করার পরিবর্তে সামাজিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মাদরাসা, মসজিদ ও ঘরোয়া বৈঠক করে দলের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করছেন। কৌশলের অংশ হিসেবে বিভন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যেও নিজেদের সংগঠিত করছেন।

শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রকাশ্যে না এসে সাথী ও সমর্থকদের দিয়ে সংগঠন গোছানোর কাজ করছেন। জামায়াতের শীর্ষ পদের নেতারা জামায়াতের কথা সরাসরি উল্লেখ না করে সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ, বিশিষ্ট সমাজসেবক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ উল্লেখ করছেন। নিজেদের সংগঠিত করে আবারও দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে এবং তারা জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে- এ আশঙ্কাও রয়েছে। এ কারণে জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মী কিংবা সমর্থকরা ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় স্বার্থান্বেষী নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরি করছেন। তারা কৌশল হিসেবে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমর্থনেও কথা বলছেন। জামায়াত শিবির নিজেদের নিরাপদ রাখতে এবং নির্বিঘ্নে তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যেতেই এ কৌশল বেছে নিয়েছেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে এবং বিভিন্ন সময় ঈশ্বরদীতে ব্যাপক নাশকতা, পুলিশের ওপর হামলা, ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াওসহ বিভিন্ন মামলায় জামায়াত-শিবিরের নেতারা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকায় দলীয় কার্যক্রম অনেকটা স্থবির ছিল। পরবর্তীতে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার ও নেতাকর্মীরা জামিনে বের হয়ে সংগঠন গোছাতে নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পুলিশি তৎপরতার কারণে তারা মাঠে নামতে না পারলেও নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্য দিয়ে নিজেদের সক্রিয় রেখেছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে।

ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নায়েব আলী বিশ্বাস দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘দলের কিছু সুবিধাবাদী ও ধান্দাবাজ নেতার হাত ধরে জামায়াত-শিবিরের অনুসারীরা আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনে অনুপ্রবেশ করেছে। পরিচয় গোপন করে থাকা জামায়াত-শিবিরের এসব অনুসারী ছাত্রলীগ ও যুবলীগে ঢুকে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। জামায়াত-শিবিরের এসব অনুপ্রবেশকারী নিজেদের সংগঠিত করার পাশাপশি দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছেন।’

বিভিন্ন সময় গোপন ঘরোয়া বৈঠক থেকে নাশকতার পরিকল্পনার সময় পুলিশ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে। রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা নিতে বৈঠকে জড়ো হয়েছিল- এমন তথ্য পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। পরে পুলিশ তাদের ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঘেঁটে দেখে, তাদের মধ্যে অন্তত ৭০ ভাগ যুবকের ফেসবুকে বঙ্গবন্ধুর ছবি রাখা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা সভা-সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে তাদের ছবি আছে। ফেসবুকে অনেকেই নিজেদের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে দাবি করছেন।

গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে জানান, শিবির চারটি ক্যাটাগরিকে টার্গেট করে সদস্য (বন্ধু) সংগ্রহ শুরু করে। এর মধ্যে আছে সিঙ্গেল ডিজিট, জিপিএ ফাইভ পাওয়া শিক্ষার্থী, মেধাক্রমে স্থান পাওয়া শিক্ষার্থী এবং প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। অনলাইনে দাওয়াতের মাধ্যমে ‘বন্ধু’ বাছাই করে তাদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ও সাংগঠনিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ আছে। সরকারি স্কুল ও কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের গোপন সাংগঠনিক শক্ত ভিত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে তারা সাংগঠনিক সম্মেলন পর্যন্ত করেছেন। ঘরোয়া বৈঠকগুলোর খবরও তারা দেন টেলিগ্রামের (নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গ্রুপ) মাধ্যমে। চেতনা-৭১, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ- এ ধরনের বিভিন্ন নামে তারা ফেসবুক গ্রুপ-উপগ্রুপ তৈরি করেন। সেই গ্রুপের মাধ্যমে নিজেরা যোগাযোগ করেন। এছাড়া বেশকিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের আড়ালে তারা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।

ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহাউদ্দীন ফারুকী বলেন, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের সংগঠিত হওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালন ও ঘরোয়া রাজনীতির মাধ্যমে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কাজ করছেন তারা।

২০১৩-২০১৪ সালে কারা নাশকতা করেছেন, মামলার আসামি হিসেবে কারা আছেন, তাদের মধ্যে জামিনে কারা আছেন- সেসব বিষয় আমরা খতিয়ে দেখছি। নাশকতার চেষ্টা হলে সর্বাত্মকভাবে প্রতিরোধের সব প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

আলাউদ্দিন আহমেদ/এমএআর/এমএস