মুক্তিযোদ্ধা মাকে বাঁচাতে ছেলের আকুতি
পাবনার তালিকাভুক্ত এবং জীবিত একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা বেগম (৮০) গুরুতর অসুস্থ। পাঁচ মাস আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তিনি।
মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় এই নারী মুক্তিযোদ্ধা এখন বাকরুদ্ধ। ভাঙা ঘরে ময়লা বিছানায় মৃত্যুর প্রহর গুণছেন তিনি। অর্থাভাবে ভানু নেছার চিকিৎসা করাতে পারছে না তার দরিদ্র পরিবার। কেউ তার খোঁজখবর নেয় না। মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছার চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চেয়েছেন তার সন্তানরা। সেই সঙ্গে অসুস্থ মাকে বাঁচাতে আকুতি জানান তারা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নন্দনপুর ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ভানু নেছা বেগমের স্বামীর নাম আব্দুল প্রামাণিক। অনেক আগেই মারা গেছেন তার স্বামী। ভানু নেছার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তার ছেলেরা দিনমজুরের কাজ করেন। মায়ের সরকারি ভাতা এবং নিজেদের সামান্য আয় দিয়ে কোনোমতে চলে সংসার। দিনমজুরের কাজের টাকায় মায়ের চিকিৎসা করাতে পারছেন না সন্তানরা।
ভানু নেছার বড় ছেলে ইউনুস আলী ও ছোট ছেলে শহিদুল ইসলাম জানান, পাঁচ মাস আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন মা। পাবনা সদর হাসপাতাল এবং ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে তার চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু মা পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। অর্থাভাবে তার চিকিৎসা চালিয়ে নেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় মাকে ফিরিয়ে আনা হয় বাড়ি। এরপর থেকে বিনা চিকিৎসায় আরও অসুস্থ হতে থাকেন মা। কয়েক মাস ধরে তিনি বাকরুদ্ধ। শারীরিকভাবে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছেন। বলা চলে যেকোনো সময় মারা যাবেন মা।
আফসোস করে ভানু নেছার বড় ছেলে ইউনুস আলী বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে মানুষটি নারী হয়েও দেশ ও মানুষের টানে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন আজ তিনিই বিনা চিকিৎসায় মরতে বসেছেন। মারা গেলেও দুঃখ থেকে যাবে মায়ের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পাবনায় ও ঢাকায় এনে মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা বেগমকে সম্মানিত করে। একই সঙ্গে বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা থেকেও তাকে পুরস্কৃত করা হয়। তখন তিনি সুস্থ ছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে গুরুতর অসুস্থতার সময়ে কেউ তার খোঁজ-খবর নেয়নি। এখন পুরোপুরি শয্যাশায়ী তিনি।
সাঁথিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল লতিফ বলেন, ভানু নেছা ছিলেন অত্যন্ত সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাদের সঙ্গে অনেক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোলাবারুদ মাথায় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বাংকারে পৌঁছে দিয়েছেন। একবার তিনি গুলিতে আহতও হয়েছিলেন।
কমান্ডার আব্দুল লতিফ আরও বলেন, ভানু নেছা সাঁথিয়া স্বাধীন না পর্যন্ত আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখায় পরবর্তীতে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
সাঁথিয়ার মুক্তিযোদ্ধা ও নন্দনপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ভানু নেছা এখন পাবনার তালিকাভুক্ত জীবিত একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি শুধু সাঁথিয়ার নয়, পুরো দেশের গৌরব। তিনি বীর নারীদের প্রতীক। কিন্তু আজ তার বড় দুঃসময়। চিকিৎসার অভাবে মরতে বসেছেন। আজ এমন দুঃসময়ে তার পাশে কেউ নেই, বুকটা ফেটে যায়। এভাবে মরার জন্য তো ভানু নেছারা দেশটা স্বাধীন করেননি। সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে আমার অনুরোধ, দ্রুত সময়ের মধ্যে ভানু নেছার চিকিৎসার দায়িত্ব নিন।
সাঁথিয়ার সিনিয়র সাংবাদিক আমিনুল ইসলাম জুয়েল বলেন, একসময়ের সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা আজ চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুশয্যায়। অর্থাভাবে তার চিকিৎসা হবে না স্বাধীন বাংলাদেশে এটা হতে পারে না।
এ বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম জামাল আহমেদ বলেন, ‘আমি সদ্য এখানে যোগদান করেছি। ওই নারী মুক্তিযোদ্ধার বিষয়টি জানতে পেরেছি। তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। ওই নারী মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করব।’
একে জামান/এএম/এমকেএইচ