পুলিশের ভুলে জীবন থেকে একদিন চলে গেল ‘তোতলা’ মিজানের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ০৭:৩১ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২০

পুলিশের ভুলে একদিন কারাবাস করলেন মিজানুর রহমান ওরফে ‘তোতলা’ মিজান। বিস্ফোরক মামলার আসামি ‘পাগলা’ মিজান। পুলিশ তাকে আটক করতে গিয়ে না পেয়ে আটক করলো ‘তোতলা’ মিজানকে। বোমা হামলা মামলায় জেলহাজতে গেল দিনমজুর তোতলা মিজান।

মঙ্গলবার ভোরে পুলিশ তাকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর ভুল বুঝতে পেরে বুধবার আদালতে প্রতিবেদন দিলে জামিন মেলে তোতলা মিজানের। বুধবার সন্ধ্যায় কারাগার থেকে মুক্তি মেলে তার। কিন্তু তার আগেই একদিন কারাবাস করতে হলো তাকে।

আটক দিনমজুর তোতলা মিজান যশোর সদর উপজেলার খোলাডাঙ্গা গ্রামের নূরুল ইসলামের ছেলে। বোমা বিস্ফোরণ মামলার এজাহার ও চার্জশিটের আসামি পাশের গ্রাম সুজলপুর হঠাৎপাড়া’র নূরুল হাওলাদারের ছেলে মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজান।

মামলা সূত্র মতে, ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি শহরতলির সুজলপুর জামতলা আকবর মিয়ার রড ফ্যাক্টরির সামনে খোলাডাঙ্গা গ্রামের সাগর, তাহের, সুজলপুরের হঠাৎপাড়ার মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজান, নাজু, জাহাঙ্গীর, রিপন, রনি ও রবিউলসহ ১০-১২ জন নাশকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে লেখা কিছু পোস্টার টাঙ্গাতে যায়।

এসময় সুজলপুর গ্রামের আব্দুস সালাম মিঠু তাদের পোস্টার লাগাতে নিষেধ করে। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আব্দুস সালাম মিঠুকে লক্ষ্য করে কয়েকটি বোমা নিক্ষেপ করে। মিঠুর চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে সাগর ও তাহেরকে দুটি বোমাসহ আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।

এ ঘটনায় আব্দুস সালাম মিঠু বাদী হয়ে আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও দুজনের বিরুদ্ধে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। প্রথমে মামলাটি তদন্ত করেন কোতোয়ালি থানা পুলিশের তৎকালীন এসআই সোলায়মান আক্কাস। সর্বশেষ মামলাটি তদন্ত করে আটজনের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন এসআই হায়াৎ মাহমুদ খান।

মামলার এজাহারে এবং চার্জশিটে আসামির নাম মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজান। বাবার নাম নূরুল হাওলাদার ও গ্রামের নাম সুজলপুর হঠাৎপাড়া উল্লেখ করা হয়। অথচ গত মঙ্গলবার ভোররাতে খোলাডাঙ্গা গ্রামের নূরুল ইসলামের ছেলে মিজানুর রহমান ওরফে তোতলা মিজানকে গ্রেফতার করেন কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের এএসআই আল মিরাজ খান। এসময় মিজান জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে চাইলেও ওই দারোগা কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ।

ভুক্তভোগী মিজান মঙ্গলবার বিকেলে আদালতের বারান্দায় সাংবাদিকদের বলেন, তিনি স্যানেটারি মিস্ত্রির কাজ করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দিনাতিপাত করেন। তার বিরুদ্ধে কোনো দিন মামলা হয়নি। কিন্তু দারোগা কোনো কথাই না শুনে তাকে গ্রেফতার করেন।

মঙ্গলবার বিকেলে বিষয়টি জানাজানি হলে পুলিশের কর্তাব্যক্তিরাও অবহিত হন। পরে তারা খোঁজখবর নিয়ে ভুল বুঝতে পারেন। এর প্রেক্ষিতে বুধবার আদালতে বিষয়টি অবহিত করা হলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মাহাদি হাসান তার জামিন মঞ্জুর করেন।

এ ব্যাপারে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ভুল আসামি ধরার অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। বুধবার আদালতে বিষয়টি অবহিত করা হয়। এরপর আদালত আটক মিজানের জামিন দেন।

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ভুলের বিষয়টি আদালতকে অবহিত করা হয়। বিষয়টি আমলে নিয়ে বুধবার আদালত নিরপরাধ মিজানের জামিন দেন। বিকেলেই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। পুলিশের এমন ভুলের জন্য মিজানের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভুল আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করায় এএসআইকে শোকজ করা হয়েছে।

এর আগেও গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি যশোরে মিঠু শেখ হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি জনির পরিবর্তে সবুজ বিশ্বাস নামে ‘নিরপরাধ’ এক যুবককে ধরে জেলে দেয় পুলিশ। সবুজের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতের বিচারক এ ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছিলেন।

এছাড়া গত ৯ ডিসেম্বর যশোরের চৌগাছায় আসামির সঙ্গে নামের মিল থাকায় মরহুম আহাদ আলী দফাদারের ছেলে আব্দুল আজিজকে কারাভোগ করতে হয়। নামের মিল থাকায় পুলিশ মূল আসামিকে না ধরে বৃদ্ধ আজিজকে ধরে কারাগারে পাঠায়।

মিলন রহমান/এমএএস/এমএস