মানুষের বিপদে সবার আগে পাশে দাঁড়াতেন সুরঞ্জিত

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ
প্রকাশিত: ১১:১৩ পিএম, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০
ফাইল ছবি।

আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের রাজনৈতিক উত্থান। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাতবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

ছোটবেলা থেকে দুরন্ত ও চঞ্চল ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্র ইউনিয়ন থেকে। সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ থেকে রাজনীতির যাত্রা শুরু তার। বিভিন্ন আন্দোলন ও সভায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন হাওরাঞ্চলে জন্ম নেয়া এই নেতা।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৪৫ সালের ৫ মে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাবা দেবেন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত ছিলেন পল্লীচিকিৎসক এবং মা সুমতিবালা সেনগুপ্ত ছিলেন গৃহিণী।

ছোটবেলা থেকে দুরন্তপনা ও গ্রামের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বেশি মনযোগ ছিল তার। যাত্রাপালা থেকে শুরু করে নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। দিরাইয়ের রাজানগর উচ্চ বিদ্যালয় ও দিরাই উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন সুরঞ্জিত। স্কুলজীবনে পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী না হওয়ায় মেট্রিক পরীক্ষায় তিনবার ফেল করেন তিনি।

চারবারের সময় মেট্রিক পাস করে সিলেটের এমসি কলেজে ভর্তি হন। তখন থেকেই তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর সেন্ট্রাল ‘ল’ কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি সম্পন্ন করে আইন পেশায় নিযুক্ত হন তিনি।

ঢাকায় আইন পেশায় কাজ করার পাশাপাশি চালিয়ে যান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি। স্কুলজীবনে মা-বাবাকে হারানো ছেলেটি দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে চালিয়ে নেন পড়াশোনা। শিক্ষাজীবনে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন সবার আগে। দিরাই উপজেলার বা শিক্ষাজীবনের বন্ধু কেউ বিপদে পড়লে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কাছে গেলে খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি। প্রয়োজনে বাবার রেখে যাওয়া জায়গা-জমি বিক্রি করে বন্ধুদের সহযোগিতা করেছেন তিনি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় ফিরে আসেন নিজের জন্মস্থানে। ওই সময় নিজেকে নিয়োজিত করেন এলাকার বিভিন্ন কাজে। হাওরাঞ্চলের ‘জাল যার জলা তার’ আন্দোলনে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৭০ সালে তরুণ সংসদ সদস্য হিসেবে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের নির্বাচনে ‘ন্যাপ’ থেকে জয়ী হয়ে আলোচনায় আসেন তিনি।

১৯৭১ সালে সংসদ সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সুনামগঞ্জের ৫ নম্বর সাব-সেক্টরের প্রথম কমান্ডার ছিলেন তিনি। তার উদ্যোগে তাহিরপুর উপজেলার ট্যাকেরঘাট এলাকায় করা হয় সেক্টরটি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্যাকেরঘাট এলাকায় করা হয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। তার নির্দেশনায় চলে মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে ন্যাপ থেকে জয়লাভ করেন তিনি। স্বাধীন দেশের প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে যেমন ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন তেমনি সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। সেই সঙ্গে সবাই বলতে থাকেন ছোট দলের বড় নেতা।

১৯৭৯ সালে একতা পার্টি থেকে সংসদ সদস্য হন তিনি। নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদান করেন তিনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে হেরে গেলে উপ-নির্বাচনে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ ও বানিয়াচং আসন থেকে জয়ী হয়ে সংসদে আসেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে নির্বাচিত হন তিনি। তিনি সুনামগঞ্জ-২ আসন থেকে ছয়বার এবং হবিগঞ্জ-২ আসন থেকে একবার জয়লাভ করেন।

স্কুল জীবনে মেট্রিকে তিনবার অকৃতকার্য হওয়া সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে ১৯৭১ সালের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য করা হয়। তাছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনী আনতে গঠিত কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলে ‘সংস্কারপন্থী’ নেতা বলে পরিচিত হন তিনি। এ কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর তাকে মন্ত্রী করা হয়নি। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেও বাদ পড়েন তিনি।

২০১২ সালে রেলমন্ত্রী হলেও তার সহকারীর গাড়িতে বিপুল পরিমাণ টাকা পাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। মন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করলেও তা গ্রহণ না করে তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সংসদে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

দিরাই আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলতাব উদ্দিন বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন সাধারণ মানুষের নেতা। রাজনীতির শুরুতে তিনি বামদলের হলেও বড় ভাই হিসেবে আমি তার স্নেহ পেয়েছি সবসময়। বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে আমরা দুই পক্ষ থাকলেও বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন আমাদের খুব প্রিয়। যখন তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন তখন আমরাই তাকে বড় আয়োজনের মাধ্যমে বরণ করে নিই। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধেয় বড় ভাই।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দাদা, দাদাবাবু বলেই বেশি সম্বোধন করতেন দিরাই-শাল্লার মানুষ। ২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ফুসফুসের সমস্যার জন্য রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় তাকে প্রথমে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নেয়া হয়। রাতেই তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

মোসাইদ রাহাত/এএম/বিএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।