কাজ করতে করতে জীবন শেষ, তবুও শোধ হয় না দাদনের টাকা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ১২:৪৫ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার পূর্বগাঁও এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম চাতাল শ্রমিকের কাজ করছেন সাত বছর ধরে। ঋণগ্রস্ত হয়ে এক সর্দারের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় আসেন চাতালকলে কাজ করার জন্য। চাতালকল মালিকের কাছ থেকে দাদন (অগ্রিম শ্রম বিক্রি বাবদ সুদমুক্ত ঋণ) নিয়ে সেই ঋণ শোধ করেছেন তিনি।

বর্তমানে তিনি আশুগঞ্জ উপজেলার সোনারামপুর এলাকার সানমুন রাইস মিলে কাজ করছেন। গত এক বছর আগে মিতালী রাইস মিল নামে একটি চাতালকলে কাজ করার সময় আনোয়ারার মাধ্যমে তার গ্রামের আরেক বাসিন্দা ইদ্রিস মিয়া আসেন চাতালকলে কাজ করতে। ইদ্রিসও চাতালকল মালিকের কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা দাদন নিয়েছেন।

কিন্তু তিনদিন কাজ করার পর ইদ্রিস চাতালকল থেকে পালিয়ে যাওয়ায় তার নেয়া দাদনের টাকা শোধের দায়ভার বর্তায় আনোয়ারার ঘাড়ে। পরবর্তীতে সানমুন রাইস মিল মালিকের কাছ থেকে দাদন নিয়ে মিতালী রাইস মিল মালিকের টাকা শোধ করেন তিনি। প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর মজুরি পান মাত্র ১০ টাকা। কত মাস বা কত বছর শ্রম দিলে দাদনের টাকা পরিশোধ হবে সেই চিন্তায় ঘুম আসে না তার। টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িও যেতে পারবেন না তিনি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার হাওরাঞ্চলের উৎপাদিত ধানের সবচেয়ে বড় হাট বসে আশুগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদীর ভিওসি ঘাটে। এই হাটকে বলা হয় দেশের পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ধানের মোকাম।

এই মোকামকে কেন্দ্র করে জেলায় সাড়ে তিনশ চাতালকল গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে আশুগঞ্জেই রয়েছে তিন শতাধিক চাতালকল। ভিওসি ঘাটের ধানের মোকামই এসব চাতালকলে ধানের জোগান দেয়। চাতালকলগুলোতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এসব শ্রমিক বছর (বৈশাখ-চৈত্র) চুক্তিতে দাদান নিয়ে থাকেন। মূলত দাদন হলো শ্রমিক আটকানোর কৌশল। দাদন নেয়ার ফলে শ্রমিকরা অন্য কোথাও যেতে পারেন না। চাতালকলেই রয়েছে শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা।

চাতাল শ্রমিকরা ধান সিদ্ধ করে মাঠে ধান শুকানো এবং ধান ভাঙিয়ে চাল করে সেই চাল বস্তায় ভরে ট্রাকে তোলার কাজ করেন। এরপর সেই চাল চলে যায় বিভিন্ন বাজারগুলোতে। কিন্তু এই কাজ করে শ্রমিকরা যে মজুরি পান তাতেও বৈষম্য রয়েছে। একজন পুরুষ শ্রমিক দৈনিক মজুরি পান ৫০ টাকা আর নারী শ্রমিক পান ১০ টাকা। মজুরির সঙ্গে কিছু চালও দেয়া হয় তাদের। কিন্তু নামমাত্র মজুরি দিয়ে সংসারের অভাব-অনটন দূর করতে না পেরে বাধ্য হয়ে বার বার দাদন নিতে হয় তাদের।

Bbaria-Rice-Mill1

সানমুন রাইস মিলের শ্রমিকদের সর্দার আলম মিয়া চাতাল শ্রমিকের কাজ করছেন প্রায় ১২ বছর ধরে। তিনিও ঋণগ্রস্ত হয়ে এক সর্দারের মাধ্যমে আসেন চাতালকলে কাজ করার জন্য। এখন পর্যন্ত বিভিন্নজনের কাছে তার প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণ আছে। কিন্তু সেই টাকা শোধ করতে পারছেন না তিনি।

আলম মিয়া বলেন, বারবার চাতালকল মালিকের কাছ থেকে দাদন নিচ্ছি। দাদনের টাকা শোধ না হওয়া পর্যন্ত এখান থেকে যেতেও পারছি না। আমার কোনো ভিটে-বাড়িও নেই যে বিক্রি করে দাদনের টাকা ফিরিয়ে দিয়ে গ্রামে গিয়ে অন্য কোনো কাজ করব। আমার ও আমার পরিবারের জীবন-মরণ এই চাতালকলেই। দুই ছেলে আছে, তাদেরকে পড়ালেখা করাতে পারছি না। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে চাতালকলে কাজ করছি। আমার দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা আর আমার স্ত্রীর ১০ টাকা। আদৌ দাদনের টাকা শোধ দিয়ে এখান থেকে বের হতে পারব কি-না সেটাও জানি না। শুধু আমি না, চাতালকলে যত শ্রমিক কাজ করে তাদের সবারই একই অবস্থা। দাদনের টাকা নিয়ে মালিকদের কাছে একপ্রকার বন্দি আমরা। একবার দাদনের টাকা কাটার পর আবার দাদন নিতে হয় সংসারের প্রয়োজনে।

শাহী রাইস মিলের শ্রমিক দিলু মিয়া গত সাত মাস আগে চাতালকল মালিকের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা দাদন নিয়েছেন। এর আগে রিজিয়া হক রাইস মিল নামে আরেকটি চাতালকলে কাজ করতেন তিনি। সেই চাতালকল মালিকের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা দাদন নিয়েছিলেন। এরপর শাহী রাইস মিল মালিকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রিজিয়া হক রাইস মিল মালিকের টাকা দিয়ে এখানে চলে আসেন।

এভাবে দাদন নিয়ে এক মিল থেকে আরেক মিল যেতে যেতেই জীবন কেটে যাচ্ছে চাতাল শ্রমিকদের। কিন্তু মুক্তি মিলছে না তাদের। এমন বন্দিদশা চাতালকলগুলোতে কাজ করা বেশিরভাগ শ্রমিকদের। অভাব-অনটন তাদের বের হতে দিচ্ছে না দাদনের বেড়াজাল থেকে। তাই তাদের মুক্তির পথটাও যেন আটকে আছে। নীরবে মুক্তির আর্তনাদ ছাড়া আর কিছুই করার নেই তাদের।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা চাতালকল মালিক সমিতির সভাপতি মো. বাবুল আহমেদ বলেন, শ্রমিকদের বারবার বলা হচ্ছে দাদন না নিতে, তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হবে। কিন্তু তারা দাদন নিচ্ছে। একজন মালিক শ্রমিকদের ১৬-১৭ লাখ টাকা দাদন দিয়ে থাকেন। দাদনের এই টাকাটা তো আর ফেরত আসে না। অনেকে টাকা নিয়ে বাড়ি চলে যায়। আগে শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম ছিল। এখন বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া শ্রমিকরা মিলের বাইরেও কাজ করার সুযোগ পান।

আজিজুল সঞ্চয়/এএম/এমএস