পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম রামগতি যান
লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসেছিলেন। পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর ঢাকার বাইরে সর্বপ্রথম তিনি রামগতির চরপোড়াগাছায় আসেন। বঙ্গবন্ধু আসার পর থেকে স্থানীয়দের কাছে স্থানটি ‘শেখের কিল্লা’ নামে পরিচিত।
তার স্মৃতি রক্ষায় আলেকজান্ডার-সোনাপুর আঞ্চলিক সড়কের পাশে উন্নয়ন সংস্থা ডরপ’র উদ্যোগে শেখের কিল্লা নামে একটি নামফলক নির্মাণ করা হয়েছে। একইস্থানে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের দাবিতে একাধিকবার মানববন্ধনসহ প্রশাসনকে স্মারকলিপি দিয়েছে স্থানীয় লোকজন।
সূত্র জানায়, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক সভায় চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে পোড়াগাছা এলাকায় বঙ্গবন্ধু স্মৃতিস্তম্ভ ও উন্নতমানের গুচ্ছগ্রাম নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই সভায় ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এ সিদ্ধান্ত দেন। এর আগে ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর ওই ভূমিমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত শেখের কিল্লা স্থানটি পরিদর্শন করেন। তখন সেখানে শেখের কিল্লার পরিবর্তে বঙ্গবন্ধু শেখের কিল্লা নামকরণ করার সিদ্ধান্ত হয়।
এদিকে আলেকজান্ডার-সোনাপুর আঞ্চলিক সড়কের পাশে শেখের কিল্লা নামফলকের স্থানেই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবিতে একাধিকবার স্থানীয়রা মানববন্ধন করেছে। সর্বশেষ ৯ মার্চ বিকেলে রামগতি উপজেলা পরিষদের সামনে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা বঙ্গবন্ধু শেখের কিল্লা স্মৃতি ইতিহাস রক্ষা কমিটির সংগঠনের আহ্বায়ক মোহাম্মদ উল্লাহ সওদাগরের সভাপতিত্বে এতে উপস্থিত ছিলেন ডরপ’র প্রতিষ্ঠাতা এএইচএম নোমান, রামগতি পৌরসভার সাবেক মেয়র আজাদ উদ্দিন চৌধুরী, উপজেলা জাসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন, চর আবদুল্লাহ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা ও উপজেলা নাগরিক কমিটির সহ-সভাপতি সালাহ উদ্দিন ফেরদৌস প্রমুখ।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল মোমিনের মাধ্যমে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়।
রামগতির প্রবীণ ব্যক্তিরা জানায়, ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সকালে হেলিকপ্টারযোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চরপোড়াগাছায় আসেন। এরপর সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষে নিজ হাতে মাটি কেটে স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধুর হাতে শুরু হওয়া সেই রাস্তাটি এখন রামগতি-নোয়াখালী আঞ্চলিক সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর সেই স্থানটি ‘শেখের কিল্লা’ নামে বেশ পরিচিত।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা জানায়, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ নিয়ে একটি মহল চক্রান্ত করছে। বঙ্গবন্ধু চরপোড়াগাছায় আসার ১৪ বছর পর ১৯৮৬ সালে গুচ্ছগ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেখানে বঙ্গবন্ধুর পদধূলি পড়েনি। ওই মহলটি ব্যবসায়িক ও স্বার্থ হাসিলের জন্য গুচ্ছগ্রাম এলাকায় বঙ্গবন্ধু স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করতে চাচ্ছে। সেখানে স্তম্ভ নির্মাণ করা হলে ইতিহাস বিকৃতি হবে। যেখানে বঙ্গবন্ধুর পদধূলি পড়েছে, সেখানেই স্মৃতি স্তম্ভটি নির্মাণ করার জোরালো দাবি উঠছে।
এ বিষয়ে কারামুক্তির পর বঙ্গবন্ধুর রামগতির জনসভায় অংশ নেয়া এএইচএম নোমান বলেন, শেখ মুজিবের স্মৃতি বিজড়িত শেখের কিল্লার স্থান নিয়ে ৪৮ বছরে কোনো মতানৈক্য ছিল না। ভূমি মন্ত্রণালয় তথা গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প নিয়ে প্রশ্নবোধক কাজ শুরুর মধ্য দিয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। খাস জমি সংকুলান নেই- প্রশাসনের এরকম ঠুনকো অজুহাতে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি চিহ্নকে বিকৃত করা হবে। ইতোমধ্যে স্তম্ভ নির্মাণের জন্য ১৬৩ শতাংশ জমি সরকারকে দেয়ার জন্য স্থানীয়রা প্রস্তুত রয়েছেন।
জানতে চাইলে রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল মোমিন বলেন, বঙ্গবন্ধু যে স্থানটিতে মাটি কেটেছিলেন, সেখানে অনেক বাড়িঘর নির্মাণ হয়েছে। ওই স্থানটি এখন খালি নেই। গুচ্ছগ্রামের জন্য প্রায় ৫০০ একর জমি বরাদ্দ আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক বিমানমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামাল বলেন, ওই জনসভায় আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী ছিলাম। শেখের কিল্লা নামফলকের স্থানেই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হবে। এরমধ্যে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
কাজল কায়েস/এমএএস/এমকেএইচ