শাশুড়িকে জমি দিয়েও বউ পাননি রশিদ, অতঃপর...

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ১০:৪৫ এএম, ১৭ মার্চ ২০২০

আব্দুর রশিদ (৩৬) একজন রোহিঙ্গা নাগরিক। প্রায় ১৫ বছর আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ঘোনারপাড়ায় এক বাড়িতে অবস্থান নেন। ২০১৫ সালে স্থানীয় হামজার ডেইল এলাকায় একখণ্ড জমি কেনার পর জমির মালিকানা শাশুড়িকে দেয়ার শর্তে মামুন পাড়ার মৃত আব্দুর রহমানের মেয়ে শফিকাকে বউ হিসেবে পান রশিদ। কিন্তু তারপরও স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করতে না পেরে এবং বারবার লাঞ্ছিত হয়ে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠেন তিনি। হত্যা করেন শ্যালককে।

২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাতে টমটম চালক রমজান হত্যার বিষয়ে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন হত্যাকারী রশিদ। ক্লুলেস এ হত্যাকোণ্ডের আড়াই বছরের মাথায় সোমবার (১৬ মার্চ) ভোরে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি এলাকা থেকে কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক হন রশিদ। পরে সন্ধ্যায় জেলা ডিবির কার্যালয়ে শ্যালককে হত্যার স্বীকারোক্তি দেন তিনি। কক্সবাজার জেলা ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর মানস বড়ুয়া বিষয়টি জানিয়েছেন।

ওসি মানস বড়ুয়া জানান, কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের তোতকখালীর ধানী জমি থেকে ছুরিকাঘাত ও এসিডে ঝলসে যাওয়া রমজান (১৪) নামের এক কিশোরের মরদেহ ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর উদ্ধার করে সদর থানা পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত কিশোরের মা ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে পরদিন ৩ ডিসেম্বর সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। কিন্তু এজাহারেও কোনো আসামির নাম উল্লেখ ছিল না।

মানস বড়ুয়া আরও বলেন, মামলাটি দীর্ঘ তদন্ত করেও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি থানা পুলিশ। পরে ২০১৯ সালের শেষের দিকে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশে হস্তান্তর হয়। থানা থেকে হস্তান্তরের পর মামলাটি নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করা হয়। এরই একপর্যায়ে উঠে আসে নিহত রমজানের দুলাভাই আব্দুর রশিদের নাম। পরে প্রযুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা এলাকায় অবস্থান নিশ্চিত হয়ে সোমবার ভোরে রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রশিদ।

জবানবন্দিতে আব্দুর রশিদ বলেন, ‘প্রায় ১৫ বছর আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে খুরুশকুল ঘোনারপাড়ায় তার পরিচিত আব্বাস নামে এক ভাইয়ের বাড়িতে অবস্থান নেন। সেখানে অবস্থানকালীন ২০১৫ সালের দিকে হামজার ডেইল এলাকায় একটি জায়গা কেনেন। জায়গা নেয়ার পর খুরুশকুল মামুন পাড়ার মৃত আব্দুর রহমানের মেয়ে শফিকাকে বিয়ে করে তাদের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। বিয়ের শর্ত ছিল কেনা জমির দলিলে শাশুড়িকে অংশিদার করা হবে। বিয়ের ১১ মাসের মাথায় শাশুড়ির শর্ত পূরণ করে জমির দলিল করেন রশিদ। এ সময় তার স্ত্রী চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

জমির মালিকানা পাওয়ার পরই রূপ পাল্টান শাশুড়ি। মেয়েকে জোর করে গর্ভের সন্তান নষ্ট করান। এ নিয়ে রশিদ ও শফিকার মাঝে পারিবারিক কলহ শুরু হয়। ঝগড়ার একপর্যায়ে রশিদকে মারধর করে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এ নিয়ে সালিশও হয়। বিচারে উল্টো রশিদকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এক পর্যায়ে শফিকার সঙ্গে তার (রশিদের) বিয়ে ভেঙে যায়।

সালিশে ধার্য করা টাকার ১৩ হাজার টাকা নগদ শাশুড়িকে দেন এবং বিভিন্ন সময় মাছ সরবরাহ করে পুরো টাকা শোধ করেন রশিদ। টাকা পরিশোধের পর শাশুড়ির কাছ থেকে জমির কাগজ ফেরত চেয়ে উল্টো লাঞ্ছিত হন রশিদ।

পরে সালিশকারক জমির উদ্দিনের শরণাপন্ন হন রশিদ। কিন্তু জরিমানার টাকা তাকে না দিয়ে শাশুড়িকে দেয়ায় জমির দলিল নিয়ে দেয়ার পরিবর্তে রশিদকে উল্টো মারধর করেন জমির উদ্দিন।

বারবার মারধরের শিকার হয়ে মনে মনে প্রতিশোধ নেয়ার শপথ নেন রশিদ। ঘটনার মাসখানেক পর (২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর) বিকেলে শ্যালক রমজানকে শহরের খুরুশকুল রাস্তার মাথায় টমটমসহ দেখতে পান রশিদ। রশিদ শ্যালক রমজানকে টমটম নিয়ে খুরুশকুল তোতকখালী পৌঁছে দিতে বলেন।

রশিদ আরও উল্লেখ করেন, তোতকখালী যেতে রাজি হওয়ার পর শহরের টেকপাড়া থেকে মদপান করেন রশিদ। এরপর তোতকখালীর একটি নির্জন জায়গায় টমটম দাঁড় করিয়ে শ্যালক রমজানকে প্রহার শুরু করেন। রমজানও পাল্টা আঘাত করে। একপর্যায়ে ধারাল ছুরি দিয়ে রমজানের হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করলে পড়ে যায় রমজান। এরপরই টমটমের ব্যাটারির এসিড মাখা পানি রমজানের সারা শরীর ঢেলে দেন। এতে তার মুখ ঝলসে যায়। শ্যালকের মৃত্যু নিশ্চিত করে টমটম নিয়ে শহরে ফিরে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে চলে যান আব্দুর রশিদ। সেখান থেকে ফিরে চট্টগ্রামে বাস করা শুরু করেন তিনি।’

ওসি মানস বড়ুয়া বলেন, যেহেতু হত্যার স্বীকারোক্তি অকপটে দিয়েছেন খুনি সেহেতু মঙ্গলবার রশিদকে কক্সবাজারের সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হবে।

সায়ীদ আলমগীর/এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।